আগামীর সাংবাদিকতায় নতুন সম্ভাবনা

আনিসুর রহমান এরশাদ

প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে সাংবাদিকতার চিরচেনা জগতকে।  ডিজিটালাইজেশনের সম্ভাবনাকে স্মার্টলি কাজে লাগানো, মাল্টি প্লাটফরমের সাথে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে নয়া নয়া কৌশল বের করা, কনটেন্ট পৌঁছাতে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করার মাধ্যমে  সাংবাদিকতায়  সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত  তৈরি হয়েছে । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন বহু সংবাদ সংস্থার জন্য সংবাদ তৈরি করছে তখনও নবীন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার মতো কনটেন্ট তৈরি করতে পারলে আগামীতে এই খাতে দাপটের সাথে টিকে থাকা সম্ভব হবে।

ভবিষ্যত সাংবাদিকতা বদলে যাচ্ছে যেভাবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাংবাদিকতা বিদ্যমান সাংবাদিকতা শিল্পকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় সাংবাদিকতা পেশাটির মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে। রোবট সাংবাদিকতার এমনভাবে উত্থান ঘটছে যে, এরা শুধু সংবাদ লেখবেই না উন্নততর বিশ্লেষণ যুক্ত করে গুণমানসম্মত স্মার্ট কনটেন্ট তৈরি করবে। সফ্টওয়্যারই  সাংবাদিকতা ও মিডিয়া খাতে ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পালন করবে। ইতোমধ্যেই সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) প্রায় ৩৭০০ কোম্পানির ত্রৈমাসিক আয়ের প্রতিবেদনগুলি সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করে নিবন্ধ তৈরি করতে অটোমেটেড ইনসাইটস সফ্টওয়্যার ব্যবহার করেছে ।

স্মার্টফোন জার্নালিজম

স্মার্টফোন ব্যবহার করে সাংবাদিকতার ধারণাটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সেলফি স্টিক ব্যবহার করে স্মার্ট ফোন জার্নালিজমকে অনেকেই স্বাগত জানাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও স্মার্টফোন ব্যবহার করে একজন গণমাধ্যমকর্মী কিভাবে দ্রুত সংবাদ প্রচারে এগিয়ে থাকতে পারেন সে বিষয়ে রীতিমতো পাঠদান হচ্ছে। সংবাদের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানতে চাওয়ার চাহিদা পূরণে স্মার্টফোন জার্নালিজম হতে পারে অন্যতম বিকল্প। তাৎক্ষনিকভাবে স্পটে দাঁড়িয়েই স্মার্টফোন দিয়ে কয়েক মিনিটের ভিডিও আপলোড করে আপনার বন্ধু, ভক্ত কিংবা ফলোয়ারদের সংবাদটা জানিয়ে দিতে পারেন।

টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রের জন্য নয়, সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতির সাথে সাংঘর্ষিক- এমন সংবাদ স্মার্টফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিও জার্নালিজম, রেডিও সাংবাদিকতা, ফটোগ্রাফি, তথ্যচিত্র তৈরি, ইনফোগ্রাফিস তৈরি, নিউজ লেখা, ই- মেইল করা, যার যার প্রতিষ্ঠানের ওয়েব সার্ভারে সম্পাদিত ফুটেজ আপলোড করা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট বা নিউজ শেয়ার করা- যাবতীয় সকল কাজ করা যায় স্মার্টফোনে।

এসব কারনেই দিনকে দিন মিডিয়া ইন্ড্রাস্টিতে জনপ্রিয় হচ্ছে স্মার্টফোনের চর্চা। ইন্টারনেট পোর্টেবলযুক্ত একটি মোবাইলসেট বা স্মার্টফোন তিনি সাধারণ নাগরিক থেকে হয়ে উঠতে পারেন এ সময়ের একজন ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট অর্থাৎ মুক্ত সাংবাদিক। ফ্রিল্যান্স জার্নালিজম থেকে প্রফেশনাল জার্নালিজম হয়ে উঠার সহজ ক্যারিয়ার। এই ক্যারিয়ারই পৌছে দিতে পারে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একজন সফল গণমাধ্যমকর্মীতে।

রোবট সাংবাদিকতা

সাংবাদিকতাকে আমূল বদলে দেওয়ার মতো ক্ষমতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আছে। রোবট সাংবাদিকতা বিষয়টা সামনের দিনে জীবনযাত্রার অংশ হয়ে উঠবে। নিজেদের এমএসএন ওয়েবসাইটের সংবাদ বাছাইয়ের জন্য সাংবাদিকের বদলে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে মাইক্রোসফট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে চাকরি হারায়েছেন এমএসএন সাইটের খবর, ছবি ও শিরোনাম সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকরা। ব্যবসা মূল্যায়নের একটি অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এসেছে এমএসএন ওয়েবসাইটে।

প্রযুক্তিগতভাবে সামনের ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে জাপানের কর্মক্ষেত্রে ৪৯ শতাংশ কাজ করে দেবে রোবট। ভবিষ্যতে অফিসের ক্লার্ক, ব্যাংক টেলার, নিরাপত্তাকর্মী, সুপারমার্কেটের দোকানদার, ট্রেন অপারেটর, বিভিন্ন খাবারের ডেলিভারি বয়, ক্লিনারসহ আরো অনেক সাধারণ কাজ রোবটদের দিয়েই করানো হতে পারে। তবে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, সমালোচক, আইনজীবী, শিক্ষক, আলোকচিত্রশিল্পী, টিভি সম্প্রচারকারক, লেখক—এদের বিকল্প কখনোই রোবট হবে না।

সাধারণ সাংবাদিক আর রোবট সাংবাদিকের কাজে তুলনা করে দেখা গেছে, রোবট সাংবাদিক জিয়াও ন্যানজিয়াও ন্যান অনেক বেশি বেশি তথ্য মনে রাখতে পারে। কপিও দ্রুত লিখতে পারে। তবে মুখোমুখি সাক্ষাৎকার নিতে শেখেনি। প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে নিজে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে না। নিউজ অ্যাঙ্গেল, অর্থাৎ কোনটা খবর সেটাও ধরতে পারে না। তবে  রোবটও এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ফুটবল ম্যাচে গ্যালারি ভরা দর্শকের আবেগ নিয়ে প্রাণবন্ত রিপোর্ট করতে সক্ষম।

সিটিজেন জার্নালিজম

স্বতস্ফূর্ত ও স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমানুষের খবর ও তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশগ্রহণের ফলে বাড়ছে সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতা। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি-পরিচয়-প্রশিক্ষণ ছাড়াই যেকেউ আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর-তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। মালিক পক্ষের স্বার্থ, বহুজাতিক কোস্পানিসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানে প্রভাবমুক্ত হওয়ায় এবং এজেন্ডা সেটিং এর ভূমিকা নেই। নির্দিষ্ট ভৌগলিক কোনো সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত নয়, নির্দিষ্ট ভাষাভাষির সকলেই বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বসে তুলে ধরতে পারেন ঘটনা, জানাতে পারেন প্রতিবাদ কিংবা ঘোষণা করতে পারেন একাত্মতা।

সিটিজেন জার্নালিজমকে স্ট্রিট জার্নালিজম, পাবলিক জার্নালিজম, ডেমোক্রেটিক জার্নালিজম, পারটিসিপেটরি জার্নালিজম বলা হয়। এছাড়া গ্রাসরুট সাংবাদিকতা, নেটওয়ার্ক সাংবাদিকতা, ওপেন সোর্স সাংবাদিকতা, হাইপার লোকাল সাংবাদিকতা, বটম-আপ সাংবাদিকতা, স্ট্যান্ড অ্যালন সাংবাদিকতা, ডিস্ট্রিবিউটেড সাংবাদিকতা বলা হচ্ছে। এখানে প্রকাশিত অডিও, ভিডিও এবং প্রতিবেদন সম্পর্কে আগ্রহী যে কারো মতামত প্রদানের সুযোগ থাকে; যে কেউ মন্তব্য-বিতর্ক-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারে। পেশাদার গণমাধ্যম কর্মী ছাড়া দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে অন্য কারো পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয় এ ধারণাকে অমূলক প্রমাণ করেছে সিটিজেন জার্নালিস্টরা।

মোবাইল জার্নালিজম

একজন সাংবাদিক  প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, ওয়েবসাইট, ব্লগসহ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে  মোবাইলের মাধ্যমেই টেক্সট, স্থির আলোকচিত্র, অডিও-অডিওসহ সব ধরনের মিডিয়া কনটেন্ট  তৈরি ও উপস্থাপন করতে পারছেন। একজন সাংবাদিকের স্মার্টফোন ব্যবহার করেই ছবি তোলা, ছবি এডিটিং, ভিডিও করা, সংবাদ সম্পাদনা, লেখা, মানুষের ইন্টারভিউ নিয়ে কর্মস্থলে সংবাদ প্রতিবেদন-সাক্ষাৎকার পাঠানো বা প্রকাশ করার সাংবাদিকতাই মোবাইল জার্নালিজম। সম্প্রচার গণমাধ্যমের জন্য পেশাদার মিডিয়া কনটেন্ট তৈরি করতে হলে ‘স্মার্টফোন ফিল্মিং’-এর বাস্তব শিল্প সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়।

অনেকে ছোট ও সহজে দেখা যায় না বলে আইফোন ব্যবহার করেন। অনেকে সস্তা হওয়ার কারণে শক্তিশালী অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করেন। মোবাইল সাংবাদিকতা করতে মোবাইলে থাকতে হয় বেশি ক্ষমতার প্রসেসর, অন্তত ১২ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা, ক্রেডলস, লেন্স, লাইট, মাইক্রোফোন এবং মোজো অ্যাপ। অনেক মোবাইল জার্নালিস্ট ল্যাপটপ ব্যবহার করে সংবাদ সম্পাদনা করলেও মোবাইল জার্নালিজমের মূল কেন্দ্রবিন্দু স্মার্টফোন। প্রতিনিয়ত মোবাইল জার্নালিজমকে সহজ করতে নতুন নতুন অ্যাপলিকেশন্স তৈরি হচ্ছে। সোশাল মিডিয়ার অডিয়েন্সদেরকে এঙ্গেজ করতে মোবাইল জার্নালিজম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

উদ্যোক্তা সাংবাদিকতা

কর্পোরেট কনগ্লুমারেট জার্নালিজমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাজারে এসেছে উদ্যোক্তা সাংবাদিকতার ধারনা। সাংবাদিকতা শিল্পে আগ্রহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অল্প পুঁজিতে তৈরি করছে অনলাইন পত্রিকা। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে বৈশ্বিক তথ্যগ্রামে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন গণমাধ্যম। ঢুকে পড়েছি নাগরিক সাংবাদিকতার যুগে। কোনো এক নাগরিক সাংবাদিকের মুঠোফোনে তোলা ভিডিও চিত্র নিয়ে হৈচৈ পড়ে যাচ্ছে পৃথিবী জুড়ে। ফেসবুকের একটি স্টাটাস হয়ে উঠছে সংবাদপত্রের লিডস্টোরী। স্মার্টফোন ইউজাররাই হয়ে উঠছেন নতুন যুগের সাংবাদিক। কনটেন্ট নির্মাতা।

সোশ্যাল মিডিয়ার পাঠক-দর্শকের কাছে পৌঁছাতে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম ধরে ধরে কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। এমন এক বাজার ব্যবস্থায় এসে পড়েছি, যেখানে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করার কিছু নেই বরং সবার কাজ করা দরকার। এখনতো সাংবাদিকরাও অর্থ যোগাড় করছেন বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের ফি হিসেবে,  বক্তৃতা দিয়ে, লেখালেখি করে, জনসংযোগে পরামর্শ দিয়ে,  ইভেন্ট মডারেশন, গবেষণামূলক কাজ ও ডকুমেন্টারি তৈরির মাধ্যমে।  অনেক সাংবাদিকরা বিজ্ঞাপনী মুনাফা বা সাবস্ক্রিপশনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নির্ভর করছে আয়ের বেশ কিছু বিকল্প উৎসের ওপর; আয় আসছে অনুদান ও সাহায্য থেকেও। এদের ক্ষেত্রে কনটেন্ট তৈরির পেছনে অনেক সময় দেয়ায় যথেষ্ট হয় না, প্রচারেও সময় দিতে হয়।

কনভারজেন্স জার্নালিজম

মোবাইলের মাধ্যমে যখন তখন রিয়েল টাইমে লাইভ স্ট্রিমিং করা সহজ। বিশ্বজুড়ে কনভারজেন্স জার্নালিজমের কথা হচ্ছে। সাংবাদিকতার এই নতুন ধারনার হাওয়া এসে লেগেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও। আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, যেখানে সাধারন জনগণ ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করেছেন, আর তার পরপরই সেটি হয়ে উঠেছে টক অব দ্যা টাউন ! স্মার্টফোন ভিত্তিক কনভারজেন্স টেকনোলজির ফলে এখন উন্নত, অনুন্নত সব দেশেই কনভারজেন্স জার্নালিজম দেখা যাচ্ছে।

ওয়ার্ডস্মিথ সফটওয়্যার

বার্তা সংস্থা এসোসিয়েট প্রেসের (এপি) ওয়ার্ডস্মিথ সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কলেজভিত্তিক খেলাধুলার প্রতিবেদনগুলো নিজেই তৈরি করে। বিশেষ অ্যালগরিদম বা কম্পিউটারের ভাষার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি করে ওয়ার্ডস্মিথ সফটওয়্যার। করপোরেট আয়ের রিপোর্ট নিয়ে প্রতিবেদন রচনায় এর সক্ষমতা একজন মানুষের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। নিয়মিত সরকারি ঘোষণা, সব পরিসংখ্যান, প্রেস বিজ্ঞপ্তি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের হাতে চলে যাবে।

অন্যদিকে মানুষের হাতে থাকবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, গভীর বিশ্লেষণ আর মানবিক আবেগ সমৃদ্ধ খবর ও কাহিনী। একজন মানুষ প্রতিবেদক যেভাবে সম্পূর্ণরূপে কাঠামোগত ও নতুন অর্থনৈতিক মোড়গুলো বুঝতে পারবে, সেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট পারবে না। স্বয়ংক্রিয়তা প্রতিবেদককে বরং বিভিন্ন জটিল হিসাব, পরিসংখ্যান ইত্যাদি ঝামেলা থেকে মুক্তি দেবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি সংবাদ কক্ষের দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। সাংবাদিকদের জন্য এআই রোবট নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যখন এআই প্রযুক্তিটি আরো উন্নত হয়ে নাক গলাতে শুরু করবে সম্পাদকীয়, তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও মানুষের আগ্রহমূলক সংবাদগুলোতে। চায়নাতে রোবট প্রতিবেদকরা প্রবন্ধও লিখছে।

 কুইল প্রযুক্তি

লেখার ক্ষমতাসম্পন্ন সফটওয়্যারটির নাম কুইল। এটি সংখ্যাভিত্তিক তথ্য-উপাত্তকে লিখিত প্রতিবেদনে রূপ দিতে পারে। টেলিভিশন এবং অনলাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের জন্য বেসবল খেলার প্রতিবেদন লেখার কাজে কুইল আগে থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। আর বিখ্যাত ফোর্বস সাময়িকীর মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে কুইল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েছে। সফটওয়্যার যদি ভালো বাক্য লিখতে পারে, মানুষের পরিশ্রম অনেকটাই কমে যায়। তাই সাংবাদিকতা ও প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে দক্ষ মানবকর্মীর বিকল্প হিসেবে সফটওয়্যারের ব্যবহার অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।

অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে কুইল সফটওয়্যার কিনেছে এবং যান্ত্রিক এই লেখার পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে। কুইল সফটওয়্যার একদল সেনা বা মানুষের এক সপ্তাহের পরিশ্রমের সমান কাজ মাত্র কয়েক সেকেন্ডে করে ফেলতে পারে।লেখার বিভিন্ন নিয়ম বা কৌশলের সমন্বয়েই কুইল সফটওয়্যারটির প্রোগ্রাম তৈরি করা হয়েছে। যেমন: বাক্য ও অনুচ্ছেদ গঠন, পৃষ্ঠাসজ্জা, কীভাবে একটা ধারণা বর্ণনা করার জন্য কোনো বাক্য শুরু করতে হয়, পুনরাবৃত্তি এড়াতে হয়, সংক্ষেপ করতে হয় ইত্যাদি।

নতুন নতুন সফটওয়্যার

কয়েকটি বড় বার্তাকক্ষ এবং সংবাদ সংস্থা কিছু দিনের জন্য খেলাধুলা, আবহাওয়া, শেয়ারবাজারের গতিবিধি এবং করপোরেট পারফরম্যান্সের মতো খবরাখবর তৈরির ভার কম্পিউটারের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল। যথার্থতা ও ব্যাপকতার বিচারে মেশিন, কিছু সাংবাদিকের চেয়ে ভালো কাজ করেছে। অনেক সাংবাদিক যেসব ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি মাত্র উৎসের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করেন, সেখানে সফটওয়্যার বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য খুঁজে এনে, সেই তথ্যের ধরন ও প্রবণতা বুঝে, ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ব্যবহার করে সেই প্রবণতাকে প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে মিলিয়ে – বিশেষণ, উপাধি ও রূপকসহ আধুনিক বাক্য গঠন করতে পারে।

বুদ্ধিমান কম্পিউটার

বুদ্ধিমান কম্পিউটার যে শুধু প্রচুর ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, তা নয়। এটি অনেক মানুষের ভিড় থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং তার সত্যতাও যাচাই করতে পরে। মিডিয়া আউটলেট ইতিমধ্যেই এআইয়ের মাধ্যমে ফ্যাক্ট চেক বা সত্যতা যাচাই করছে।রয়টার্স। সামাজিক মাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ ট্র্যাক করতে এবং টুইটের সত্যতা যাচাই করতে তারা নিউজ ট্রেসার ব্যবহার করছে।

অটোমেটেড সাংবাদিকতা

ডেটা থেকে স্টোরি তৈরি  মূলত খেলাধুলা এবং আর্থিক খাতের রিপোর্ট করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটা সাংবাদিকদের রুটিন বা গৎবাঁধা কাজ থেকে মুক্ত রাখে, দক্ষতা বাড়ায় এবং খরচ কমায়। ওয়াশিংটন পোস্ট খেলাধুলা এবং নির্বাচনী রিপোর্টিং-এর জন্য নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি হেলিওগ্রাফ ব্যবহার করছে।

পারসপেকটিভ এপিআই টুল

ওয়ার্কফ্লো সাজানো হচ্ছে- ব্রেকিং নিউজ ট্র্যাকিং, ট্যাগ এবং লিংক ব্যবহার করে খবর সংগ্রহ ও সাজানো, মন্তব্যগুলো মডারেট করা এবং কণ্ঠ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুলিপি তৈরি। নিউ ইয়র্ক টাইমস পাঠকের মতামত মডারেশনের জন্য জিগ্স-এর (অ্যালফাবেট, গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি) তৈরি পারসপেকটিভ এপিআই টুল ব্যবহার করে। সাংবাদিকদের জন্য রয়টার্স কানেক্ট নামের প্ল্যাটফরমটি রয়টার্সের সকল কনটেন্ট, আর্কাইভ, এমনকি তাদের বিশ্বজোড়া পার্টনারদের পাঠানো কনটেন্টও রিয়েল টাইমে প্রদর্শন করে।

নিউজহুইপ

হালনাগাদ এবং ঐতিহাসিক ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারদের (প্রভাবিত করতে পারে এমন) শনাক্ত করা এবং দর্শকদের যুক্ত করা। এপি সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড পর্যবেক্ষণ এবং এনগেজমেন্ট বাড়াতে নিউজহুইপ ব্যবহার করে।

ওপেন সোর্স নিউজবট

দর্শকদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে  কোয়ার্টজ বট স্টুডিওর চ্যাটবট অ্যাপ্লিকেশনটি  কাজ করে।এটি  তার ব্যবহারকারীদেরকে ঘটনা, ব্যক্তি, বা স্থান সম্পর্কে প্রশ্ন পাঠানোর সুযোগ দেয় এবং সেটি প্রাসঙ্গিক কনটেন্টসহ জবাবও পাঠায় প্রশ্নকর্তাকে। গার্ডিয়ান-এর মতো অনেকেই ফেসবুক মেসেঞ্জারের জন্য বট ব্যবহার করে। বিবিসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের গণভোট কভারের জন্য বট ব্যবহার করেছিল।

ইউরোপিয়ান জার্নালিজম সেন্টার এবং দ্য সোর্স (নামিবিয়া ও জিম্বাবুয়ে) এর ’ইনোভেট আফ্রিকা’ অনুদান বিজয়ী আফ্রিবট প্রকল্পটি ‘আফ্রিকান সংবাদ সংস্থাগুলোকে নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী (পার্সোনালাইজড) সংবাদ প্রদান এবং মেসেজিং প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে পাঠকদের সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়ার’ সুযোগ করে দিতে একটি ওপেন সোর্স নিউজবট তৈরি করছে।

স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাই

এর মাধ্যমে কোনো বিবৃতি বা দাবিকে দ্রুততার সঙ্গে যাচাই করা যায়। আর্জেন্টিনার তথ্য যাচাই প্রতিষ্ঠান চেকেডো এজন্য ব্যবহার করে চেকেবোট। ফুল ফ্যাক্ট ইউকে এবং তার পার্টনাররা একটি স্বয়ংক্রিয় ফ্যাক্ট-চেক ইঞ্জিন তৈরি করছে, যা ‘এরই মধ্যে যাচাই হয়ে যাওয়া দাবি চিহ্নিত করবে এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও সুবিন্যস্ত ডেটা ব্যবহার করে যেসব দাবি এখনো যাচাই হয়নি সেগুলো শনাক্ত ও যাচাই করবে ’।

আমেরিকার ডিউক রিপোর্টার্স ল্যাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ দাবিগুলোকে যাচাইয়ের জন্য গণমাধ্যমে পাঠাতে ক্লেইমবাস্টার নামের একটি টুল তৈরি করেছে। ২০১৭ সালে স্বয়ংক্রিয় ফ্যাক্টচেক প্রকল্পগুলোর জন্য একটি হাবও চালু করে তারা। যুক্তরাষ্ট্রে ফ্যাক্টম্যাটা তৈরি করেছে একটি অটোমেটেড ফ্যাক্টচেক টুল। এখানে আরো জানতে পারেন স্বয়ংক্রিয় তথ্য যাচাই সম্পর্কে।

বড় ডেটাবেস বিশ্লেষণ

তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে কোনো পরিবর্তন, প্যাটার্ন বা অস্বাভাবিকতা অনুসন্ধান করে সফটওয়্যার। রয়টার্সের লিংকস ইনসাইট বড় আকারের ডেটাসেটে গিয়ে সেখান থেকে ফলাফল এবং ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা সরবরাহ করে সাংবাদিকদের। ওসিসিআরপির ক্রাইম প্যাটার্ন রিকগনিশন দলিলপত্রের বড় ডেটাবেস থেকে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের দুর্নীতির তথ্য এবং এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের মধ্যকার সংযোগও বিশ্লেষণ করতে পারে।

ইমেজ রিকগনিশন

যে প্রযুক্তি ছবি থেকে বস্তু, এলাকা, মানুষের মুখ, এমনকি অনুভূতিকেও শনাক্ত করতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস ছবি থেকে কংগ্রেস সদস্যদের শনাক্ত করতে আমাজন-এর রিকগনিশন API ব্যবহার করে। যে-কোনো ব্যবহারকারী বিনামূল্যে Google-এর ভিশন API ইমেজ রিকগনিশন প্রযুক্তি পরীক্ষা করতে পারেন।

স্বয়ংক্রিয় ভিডিও কনটেন্ট

স্বয়ংক্রিয়ভাবে খবর থেকে স্ক্রিপ্ট এবং ফুটেজ থেকে ছোট ছোট টুকরো কেটে ধারাবর্ণনাসহ ভিডিওর রাফ-কাট তৈরি করা। এই কাজে ইউএসএ টুডে, ব্লুমবার্গ এবং এনবিসি ব্যবহার করে উইববিটজ নামের একটি সফটওয়্যার। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও স্বয়ংক্রিয় ভিডিও সম্পাদনা টুল তৈরি করছেন।

বহুমাধ্যমকেন্দ্রিক জার্নালিজম

এ যুগের সাংবাদিকতা প্রতিটি স্তরেই প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমাধ্যমকেন্দ্রিক। কালের পরিক্রমায় উদ্ভাবিত সাংবাদিকতার বিভিন্ন কাঠামোকে ধারণ করেই আজকের সাংবাদিকতা বহুমাধ্যম বৈচিত্র্য অর্জন করেছে। বিংশ শতকে এসে সাংবাদিকতা বহুমাধ্যম বাহিত পেশায় রূপ লাভ করতে থাকে।

একবিংশ শতকের গোড়া থেকে মূলত সাংবাদিকতা প্রাযুক্তিক প্রভাবে মাধ্যম বহুমাত্রিকতার পাশাপাশি চর্চায় বহুমাত্রিক রূপ পেতে থাকে। এ যুগের সাংবাদিকতায় যেসব চরিত্র পরিলক্ষিত হয় তার মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার ও বহু-আধেয় ভিত্তিক চর্চাই অন্যতম। অনেক প্রতিবেদনের ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যাটেরিয়াল এখন ঘরে বসে ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। তাড়াহুড়া করে হাতে লিখে নোট নেওয়ার পরিবর্তে তথ্য রেকর্ড করার বিভিন্ন ডিভাইস এখন সহজলভ্য।

সূত্র: গার্ডিয়ান, বিবিসি, সিয়াটল টাইমস, পিসি কোয়েস্ট, এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ, www.ipsnews.net, www.weforum.org, gijn.org  ও www.ericsson.com

About আনিসুর রহমান এরশাদ

শিকড় সন্ধানী লেখক। কৃতজ্ঞচিত্ত। কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী। ভেতরের তাগিদ থেকে লেখেন। রক্ত গরম করতে নয়, মাথা ঠাণ্ডা ও হৃদয় নরম করতে লেখেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার আগ্রহ থেকেই বিভিন্ন সময়ে পাক্ষিক-মাসিক-ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন, সাময়িকী, সংকলন, আঞ্চলিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ও জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পর্ক। একযুগেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সম্পাদনার সাথে যুক্ত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। পড়েছেন মিডিয়া ও জার্নালিজমেও। জন্ম টাঙ্গাইল জেলার সখিপুর থানার হাতীবান্ধা গ্রামে।

View all posts by আনিসুর রহমান এরশাদ →

One Comment on “আগামীর সাংবাদিকতায় নতুন সম্ভাবনা”

  1. Pingback: Newsify

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *