অনুভূতি প্রকাশের ভাষা হিসেবে বাংলা

আনিসুর রহমান এরশাদ : মানুষ প্রতিমুহূর্তে স্পন্দন ও প্রবাহের মধ্য দিয়ে তার জীবিত ও জাগর সত্তাটিকে অস্তিত্বময় করে রাখে। আর তার অস্তিত্ব ও অবস্থান, গতি-প্রকৃতি ও শক্তির অন্বয় রচনা করে। অস্তিত্বের জন্য, মনুষ্যত্ব ও মানবিক অর্জনের জন্য তার ভাষা ব্যবহার করে। ভাষার চালিত শক্তির প্রয়োগে তার দেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ যেমন সঞ্চালিত হয়, মস্তিষ্ক কোটর, স্মৃতিকোষ, চেতনা- চৈতন্য, অনুভূতি ও উপলব্ধি তেমনি ক্রিয়াশীল হতে থাকে। ব্যক্তিসত্তা ভাষার মাধ্যমে জাগরিত হয়-বিকশিত হয়। একটি জাতির সত্তাও প্রথমত এবং শেষত ভাষার মধ্য দিয়ে বিকশিত হতে থাকে। ভাষা মানুষের অস্তিত্বকে ধারণ করে এবং স্পন্দমান করে। বিশ্বাসকে বাক্সময় ও বিভাসিত করে। অন্ত:সলিলার মতো বেয়ে যেতে থাকে অর্ন্তলোকের সন্ত্রস্ত অন্দর-কন্দর পেরিয়ে। ভাষা মানবজীবনের ফল্গুধারাই যেন।

বাংলাভাষা আমাদের পৃথক জাতিসত্তা গঠনের অন্যতম মৌল উপাদান। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। প্রত্যেকটি ব্যক্তি মায়ের পরেই সম্ভবত মায়ের প্রতি হয় সর্বাধিক অনুরক্ত। মা যেমন নিজের ভাষার অনুভবকে বহন করে চলেন মায়ের ভাষার গর্বিত উত্তরাধিকার। তাই দেখা যায়, প্রত্যেক মানুষের নিকট তার মায়ের ভাষা অত্যন্ত আপন সম্পদ।

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এটা আমাদের গর্ব। আর একটা বিশেষ গর্বের ব্যাপার হচ্ছে আমাদের ভাষাটি প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানসম্মত। খুবই সমৃদ্ধ ভাষা বাংলা।

আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা স্রষ্টার সেরা দান। নিজের মাতৃভাষা মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এক বড় সম্পদ আর ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। প্রত্যেকের মাতৃভাষাই তার প্রিয়তম সম্পদ। ইহা মানুষের অদ্বিতীয় সত্তার মতো এবং আ-মৃত্যু তার সঙ্গী। আমাদের মাতৃভাষা-প্রীতি ও স্বদেশপ্রেম অবিচ্ছেদ্য এবং একসঙ্গে প্রথিত।

কবি বলেছেন,
‘নানান দেশের নানান বলেছেন,
বিনা স্বদেশি ভাষা মিটে কি আশা?

এক নজরে দেখে নিন লুকিয়ে রাখুন

বাংলা ভাষায় অনুভূতি প্রকাশ

অনুভূতি প্রকাশের ভাষা বাংলাই আমাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। কেননা এ ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সর্বোপরি আমাদের মাতৃভাষা। এজরা পাউন্ডের কথায়, মাতৃভাষা হলো, ‘ওষ্ঠ লালিত জীবনের কাকলি’ এবং এই কাকলি অনুরণিত হয় মাতৃক্রোড়েই। সুরেলা পাখি যেমন সুরলহরি বহন করে তার চঞ্চুতে, মানুষও তেমনি তার শৈশবকাল থেকে মাতৃভাষার লাবণ্য বহন করে বলে তার ওষ্ঠ-পুটে। তার প্রথম শব্দ উচ্চারিত হয় মাতৃভাষায়। এসব কারণে ভাষার প্রতি তার আসক্তি এবং অনুরাগ অনেকটা সহজাত। তাই মাতৃভাষা বাংলার কোনো বিকল্প নেই।

সুখ-দুঃখের অনুভূতি প্রকাশের বাহন

বাংলা ভাষা বাঙালিদের যোগাযোগের উত্তম মাধ্যম। কেননা এটি মাতৃভাষা। অর্থনৈতিক বিকাশের কারণে সমাজে নানা টানাপোড়েন চলতে থাকে। এর প্রভাব মানুষের মনোজগতেও পড়ে। দীর্ঘাদিনের অভ্যেস, ধ্যান-ধারণা আদিম আবেগের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু পণ্য উৎপাদনের গতি বাড়তে থাকলে সমাজের গ্রন্থিগুলো। শিথিল হতে থাকে। আদিম সেই আবেগ ও ভেঙ্গে যেতে থাকে।

মানুষ তখন আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে থাকেন। মনে মনে হতাশও হতে থাকেন। মনে মনে তারা তখন সামাজিক সমাবেশ বা রাজনৈতিক আচার-অনুষ্ঠানের মাঝে ভেঙ্গে যাওয়া-আবেগের বিকল্প খুঁজতে থাকেন। এ রকম সময়ে মানুষ ভীষণ নিরাপত্তা হীনতায় ভোগেন। তখন মানুষ সাধারণ একটি ভাষা অথবা বড় একটি জাতীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নিজের নিরাপত্তা খোঁজেন। একই ভাষায় কথা বলে অনেক মানুষ এবং অন্যের ভাবনায় শরিক হওয়ার চেষ্টা করে। অন্যের চেতনার সন্ধান করে মানুষ। এভাবেই ভাষা হয়ে ওঠে সুখ-দুঃখের বাহন।

পারস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন

বাংলাভাষার মাধ্যমে আমরা পরস্পর ভাব বিনিময় করি। এই ভাষাই পরস্পরের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। যে ভাষায় মনের ভাব সুন্দরভাবে প্রকাশ করা যায় তার গুরুত্ব খুব বেশি। মানুষের ধ্যান-ধারণা, আবেগ-অনুরাগ, সুখ-দুঃখ, মাতৃভাষায় যেভাবে প্রকাশ করা যায়, অন্য কোনো ভাষায় সেইরূপে প্রকাশ করা সম্ভভ নয়।

যৌগিক সাংশ্রয়

সকল প্রাণীরই কোনো না কোনো রকম যোগাযৌগিক সাংশ্রয় আছে। মৌমাছি নৃত্য পরিবেশন করে মৌচাকের অপর অংশের স্থান ও মৌ-এর পরিবেশ নির্দেশ করতে পারেন। কোনো কোনো মাছ নৃত্য পরিবেশন করে মধুর ভাব প্রকাশ করতে পারে। উচ্চ পর্যায়ের প্রাণীদের মধ্যে সুর প্রক্রিয়া, বিপদ সংকেত এবং খাদ্যের উপস্থিতি জ্ঞাপন করার পদ্ধতি আছে। প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকারী যে, সে হচ্ছে মানুষ।

বাংলা ভাষাভাষীরা যোগাযোগ, ভাববিনিময়ের জন্যে বাংলা ভাষার মত একটি উন্নত ব্যবস্থার অধিকারী হওয়ায় নি:সন্দেহে দারুণভাবে তৃপ্ত।

সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বহি:প্রকাশ

ভাষা হচ্ছে মানুষের যৌথ সম্পদ। সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি এ সম্পদের উত্তরাধিকার, ভোগ করে, নতুন ঐতিহ্য সৃষ্টি করে এবং উত্তরাধিকারকে সৃজনশীল মানবীয় প্রক্রিয়ায় সম্প্রসারিত করে। ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে তাকে বিচ্ছিন্ন করা দুঃসাধ্য।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ভাষা না থাকলে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবধর্ম থেকে বঞ্চিত হতো। ভাষার সঙ্গে সমাজের চার প্রকারের সম্পর্ক আছে-১) ঐতিহাসিক সম্পর্ক ২) সাংগঠনিক সম্পর্ক ৩) জ্ঞানতাত্ত্বিক সম্পর্ক ৪) সাংকেতিক সম্পর্ক

সমাজের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে আমাদের বাংলাভাষায় প্রয়োজনীয় অনুভূতি প্রকাশ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অন্তর্নিহিত সহজা ক্ষমতার প্রকাশ

ভাষা নামক যে শৃঙ্খলাটি মানুষ হাতিয়ার হিসেবে লাভ করেছে তার প্রধানত উৎসভূমি এবং প্রসারভূমি সমাজ। মানব শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে কোনো ভাষা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে না। আমরা এই সমাজ থেকেই ক্রমে ক্রমে বাংলাভাষার সংকেতগুলো আয়ত্ব করেছি। এ কাজটি করেছি অন্তর্নিহিত সজাত ক্ষমতার বলে। ভাষার প্রয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হয়।

আমাদের অস্তিত্বের সাক্ষ্য

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। তাই এর প্রতি রয়েছে আমাদের গভীর ভালবাসা। মাতৃভাষা কথাটার মধ্যেই একটা সহজাত আবেগ আছে-এ বাইরে থেকে আয়ত্ত বা ধার করা নয়। ভিতর থেকেই এর উৎপত্তি এর সম্পর্ক নাড়ীর সঙ্গে। মর্মমূলে সাড়া জাগায় এ সমস্ত সত্তা ধার দেয় টান। এটাই আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত, বাঁচার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সর্বাঙ্গীণ বিকাশের অবলম্বন

ভাষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে। ভাষা ছাড়া মানুষ ভাবতে পারে না, কল্পনা করতে পারে না। পারে না চিন্তা করতে পর্যন্ত। মানুষই একই সঙ্গে প্রকাশ আর বিকাশধর্মী জীব-ভাষা ছাড়া মানুষ নিজেকে প্রকাশ করতে অক্ষম। মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশও ভাষাকে অবলম্বন করেই ঘটে। তাই ব্যক্তির ব্যক্তি হয়ে উঠতেও চাই ভাষা। ব্যক্তিত্ব ও ব্যক্তি জীবনের বিকাশও ঘটে ভাষার সাহায্যেই।

ভাষা ছাড়া মানুষ, মানুষ হতে পারে না-ভাষার সোপান পরস্পরা পার হয়েই আদিম বন্য মানুষ আজ সভ্য মানুষে পরিণত। তার আশা অভীপ্সা যে াআজ চন্দ্র আর মঙ্গল গ্রহের অভিযাত্রী তার মূল উৎস-মুখ ভাষা। ভাষাকে আশ্রয় করেই মানুষের মন লালিত পালিত ও বিকশিত। তার সভ্যতা সংস্কৃতি ধর্মকর্ম সবকিছুই ভাষা আশ্রিত। স্রেফ খাওয়া পরা বা ভাত কাপড় মানুষকে মানুষকরতে পারে না।

মানুষের অন্তর্জীবন, ভাবজীবন তথা মন-মানসকে কেন্দ্র করে যে জীবন-তাই মানুষকে করে তুলে মানুষ। ভাষা এসবের একমাত্র বাহন আর সে ভাষা যে মাতৃভাষা তাতে দ্বিমত নেই পৃথিবী ব্যাপী কোথাও। মাতৃভাষার এ ভূমিকা ব্যক্তিগত যেমন তেমনি জাতিগতও। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়।

সমাজের প্রবাহমান ধারা

প্রফেসর আনিসুজ্জামান বলেছেন, ভাষার কোনো শ্রেণী নেই। তবে ভাষার মধ্যে সমাজের ধারা প্রবাহিত হয়। ভাষা ব্যবহারে শ্রেণী বৈষম্য ফুটে ওঠে।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষাকে সমাজ বিকাশের ধারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। ভাষার ইতিবাচক জন্মান্তর তখনই ঘটে যখন তার গতি হয় সর্বজনসুখী। ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক টানতে গিয়ে মনসুর মুসা লিখেছেন, বাংলাভাষার গতিশীলতার পেছনে মূলশক্তি হিসেবে কাজ করছে এর সাধারণ মানুষের জীবনবোধ ও সংগ্রামের সঙ্গে সহমর্মিতা।

ভাষা যদি দু’জনের ব্যবহার করা সম্ভব না হতো তাহলে সমস্ত উৎপাদন ব্যবস্থা, সামাজিক সম্পর্ক, লেনদেন ইত্যাদি ভেঙ্গে পড়তো। বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে এদেশের মানুষের সমাজ জীবন বা সামাজিক উৎপাদনের কথা কল্পনা করা যায় না।

আত্মপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ বাহন

মানুষের আত্মপ্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন হচ্ছে ভাষা। সেই কারনে সংস্কৃতি ভাষাকেই প্রধানত: অবলম্বন করে থাকে। ভাষা হচ্ছে মানুষের সভ্যতার আদিমতম প্রয়োজনের একটি। ভাষার সৃষ্টিই হয়েছে মানুষের পরের আদান প্রদান এবং সামাজিক ক্রিয়াকর্মের প্রয়োজনে। আর এই ভাব বিনিময়ের বাহন কোনো দেশেই রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। দিনের পর দিন। বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জাতির সমগ্র জাতীয় চরিত্র।

দেয় প্রাণ-মনকে তৃপ্তি আর চিন্তা-চেতনাকে দীপ্তি

বাংলা ভাষা আমাদের প্রাণ-মনকে দেয় তৃপ্তি আর চিন্তা চেতনাকে দেয় দীপ্তি। মাতৃভাষায় কথা বলে কিংবা মনের ভাব প্রকাশ করা যত সহজ অন্য ভাষায় সেটা তত সহজ নয়। মাতৃভাষা সহজাত আপন ভাষা, অন্য ভাষা পরের ভাষা। মাতৃভাষা যেমনি প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার অবলম্বন, তেমনি চিন্তাচেতনা, জ্ঞান বিজ্ঞান সাধনার মাধ্যম হিসেবেও এর কোনো বিকল্প নেই। তাই বাংলাভাষাকে আশ্রয় করেই প্রকৃতপক্ষে দেশের মানুষের চিৎশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি, সৃষ্টি শক্তি ও কল্পনা শক্তির যথার্থ বিকাশ সম্ভব।

নিজের ভাব অনের হৃদয়ে সঞ্চারিত করা

ভাষা ভাবের বাহন। ভাব প্রকাশের তাগিদে ভাষার উদ্ভব। মানুষের সহজাত প্রবণতাই হল একের ভাব অন্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত করে একই ভাবে ভাবিত করানো।

ড. সুকুমার সেন বলেন, ‘ভাষার মধ্য দিয়া আদিম মানুষের সামাজিক প্রবৃত্তির প্রথম অঙ্কুর প্রকাশ পাইয়াছিল; ভাষার মধ্য দিয়াই এই সামাজিক প্রবৃত্তি বদ্ধমূল হইয়া বানর কল্প আদিম নরকে পশুত্বের পর্যায় হইতে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন তাহাকে মননশীল মানুষ করিয়াছে। ভাষা চিন্তার শুধু বাহন নয়, প্রসূতিও।’১০ (ক)

ভাষাতাত্ত্বিক মুহম্মদ আব্দুল হাই বলেছেন, ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিকতা বজায় রাখতে হলে তার প্রধান উপায় কথা বলা, মুখ খোলা, আওয়াজ করা। একে অন্যের সঙ্গে সম্বন্ধ যেমনই হোক না কেন-শত্র“তার কি ভালবাসার, চেনা কি অচেনার, বন্ধুত্বের কিংবা মৌখিক আলাপ পরিচয়ের, মানুষের সঙ্গে মানুষের যেকোনো সম্বন্ধ স্থাপন করতে গেলেই মানুষ মাত্রকেই মুখ খুলতে।১০ (খ) আর এক্ষেত্রে আমাদের জন্য মাতৃভাষা বাংলা অতুলনীয়।

মনের বিচিত্র ভাব প্রকাশের বাহন

মানব মনের বিচিত্র ভাব প্রকাশের বাহনতো ভাষাই। সংস্কৃতি হচ্ছে ভাব, ভাষা তার রূপ। জীবন যেহেতু গভীরতর অর্থে অনুভবের সমষ্টিমাত্র এবং যেহেতু সে অনুভূতি অনুভবযোগ্য হয়ে রূপ পায় ভাষায়, সেহেতু ভাষা জীবনানুভূতির নামান্তর মাত্র। মানুষের মান-মার্জিত যা কিছু সম্পদ তা বলতে গেলে এই ভাষারই প্রাণ।১১

ভাষা খেলা করে জিবের ডগায়, ঘোষিত হয় গলার মধ্য দিয়ে, প্রাণলাভ করে ফুসফুস থেকে। এও বাইরের সত্য। আসলে ওর জন্ম বুকের মধ্যে, উৎস মানুষের মন।১২

আমরা বাংলাভাষার মাধ্যমে রীতিনীতি বা আচার-ব্যবহারের সঙ্গে পরস্পরকে পরিচিত করে তুলি নিজস্ব ধ্যান-ধারণার সঙ্গে অন্যকে পরিচিত করে তুলতে, অন্যের ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা জগতের সঙ্গে নিজে পরিচিত হতে এই ভাষার বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত মনের অভিব্যক্তির সঙ্গে অন্যকে পরিচিত করে তুলতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য।

আমাদের শক্তির উৎস, অস্তিত্বের ভিত্তিভূমি

ভাষার গতিপথ গিরিস্রোতের মত অবাধ ও অনবরুদ্ধ, বাধা ঠেলে অগ্রসর হওয়াই তার স্বভাব বাংলা ভাষাও তাই করেছে। জীবনের মত ভাষার গতি হয়েছে বিচিত্রমুখী ও বিচিত্রগামী। বাংলা ভাষাই আমাদের রক্ষাকবচ। বাংলা ভাষাই আমাদের শক্তির উৎস, অস্তিত্বের ভিত্তিভূমি।১৩

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাভাষা ছাড়া, মাতৃভাষা ছাড়া, শিক্ষার বাহন, আর কিছুই হইতে পারে না। তাই আমাদের বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল। যদি আমরা সব অর্থেই জীবনের সর্বত্র আত্মনির্ভরশীল হতে চাই তাহলে ভাষার আত্মনির্ভরশীলতা তার একটা বড় অংশ হবে।১৪

ভাষা কেবল আপাতত: প্রয়োজন সাধনের উপায় বা ভাবপ্রকাশের বাহনমাত্র নয়। এর কাজ হচ্ছে জাতীয় জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, জাতির দেহে নতুন জীবন বা চলমানতা সঞ্চয় করা।১৬

আমাদের চেতনা গড়ে ওঠে বাংলা ভাষার মাধ্যমে। মায়ের সাথে, মাটির সাথে, দেশের সাথে, প্রকৃতির সাথে যোগসূত্র গড়তে হলে প্রয়োজন বাংলা ভাষারই। তার গুনগুন ধ্বনির মাধ্যমে হয়তো অন্য মৌমাছিকে জানাতে পারে যে, কোথায় ফুল ফুটেছে-কিন্তু এর অতিরিক্ত আর কিছুই তারা ব্যক্ত করতে পারে না। কাক তার কর্কশ স্বরে আর্তনাদ করে অন্য কাককে বিপদে আশঙ্কা সম্বন্ধে সচেতন করে দিতে পারে, ঝিঁ ঝিঁ পোকা তার স্বরে তার সাথীর সন্ধান করতে পারে, কিন্তু এর অতিরিক্ত, কোনো আন্দ- বেদনা বা অভাব-অভিযোগের কথা প্রকাশ করতে পারে না। অর্থাৎ অন্যান্য প্রাণী যেখানে শুধুমাত্র নিছক প্রয়োজনীয় অভিব্যক্তি প্রকাশে সীমাবদ্ধ। সেখানে মানুষ তার ভাষার সাহায্যে শুধু যে জটিলতর চিন্তাধারার প্রকাশে সক্ষম হয় তা-ই নয় বরং প্রয়োজনে পুন:পুন: সে একই অভিব্যক্তি ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করে যেতে পারে বা তাতে অনবরত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এনে নতুন করে প্রকাশ করতে পারে। আর এখানে প্রমাণিত হয় যে, প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষের স্থান সবার উপরে। প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সর্বাধিক শ্রেষ্ঠত্বের বা যোগ্যতার দাবি রাখে। এবং এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের ভাষা সৃষ্টি ও প্রয়োগের কুশলতার ফলে। মানুষের স্থান সবার উপরে। মানুষের ভাষাই মানুষকে সৃষ্টি জগতে শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষার কারনেই আমরা শ্রেষ্ঠ।১৬

বাংলায় অনুভূতি প্রকাশেই মানসিক প্রশান্তি

কিমবারলি ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স সেন্টারের প্রধান কর্মকর্তা জুন অস্কার বলেন, ‘আপনি নিজের অনুভূতি যেভাবে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন সেভাবে ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারবেন না। আপনি অনুভব করতে এবং বুঝতে পারছেন কী বলা হচ্ছে, কিন্তু ঠিক তা মাথায় ঢুকছে না। যখন দেশে আমরা নিজেদের ভাষা বলি তখন আমাদের মনে হয় সেই দেশ সেই সময়ের শুরু থেকে আমাদের কথা শুনে আসছে এবং আমরা এখন এমন ভাবতে চেষ্টা করি যেন সময়ের গোড়ায় আমরা ফিরে গেছি এবং এই দেশটা যেন সেই একটি মাত্র ভাষাই জানে।১৭

যখন আমরা দেশে যাই এবং লোকে দেশের কথা বলে, তখন মনে হয় আমরা কেবল দেশের সঙ্গে কথা বলছি না, বরং এই দেশের যেসব মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, তাঁদেরও সঙ্গে কথা বলছি।’১৮

তাই বাংলা ভাষায় তথা আমাদের মাতৃভাষায় অনুভূতি প্রকাশে যে মানসিক প্রশান্তি লাভ হয় তা অন্যভাষায় পাওয়া অসম্ভব।

বাংলা ভাষাই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে

বাংলাভাষা শুধুমাত্র কয়েকটা সীমিত মানসিক চিন্তাধারার প্রকাশ বাহনে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষার গঠন-বিন্যাসই স্বতন্ত্র। অন্তর্নিহিত যুক্তি ও রীতি অনুযায়ী প্রতিটি ভাষাই এ ভাষার নিজস্ব অন্যান্য অংশের সাথে আত্মীয়তা বন্ধনে আবদ্ধ। বাংলা ভাষাই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ঐ ভাষাভাষীদের প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অর্থাৎ সামগ্রিক পরিবেশকে প্রকাশ করার যোগ্যতা রাখে।

এডওয়ার্ড সাপিবের মতে, ভাষা হচ্ছে যোগাযোগ এবং প্রকাশের মাধ্যম। ভাষা সব সংস্কৃতির মধ্যেই আছে। বাংলাভাষা সৃজনশীল, উৎপাদনশীল, রূপান্তশীল, নিজে বদলাবার, সাজাবার, উপাদান, পুনরুৎপাদন করার ক্ষমতা এই ভাষার মধ্যেই আছে। অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের মাধ্যম এটি।

বোয়াস ভাষা ও সংস্কৃতিকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বলেছেন। বাংলা ভাষার মাধ্যমে এই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মন:স্তত্ত্ব বুঝতে পারিী। নিজস্ব অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। ব্যক্তিক অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তির উর্দ্ধে নিয়ে যেত পারি। সুতরাং অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে।

উপসংহার

বাংলাভাষা ও বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বাংলাভাষা হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কজাত মানবীয় ক্ষমতা যা আমাদেরকে সমাজ-গঠনে, সমাজ সংরক্ষণে এবং সমাজ বিকাশে সহায়তা করেছে।

বাংলা ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি আমাদের জন্য এমন এক প্রত্যয় যার সঙ্গে আমাদের সমগ্র জীবন জড়িয়ে রয়েছে। ভাষার দীনতা তাই আমাদের সামগ্রিক দীনতার প্রকাশ। আমাদের বিকাশ তাই ভাষারও বিকাশ। আমাদের প্রকৃত অগ্রগতি মাপার এও এক অনিবার্য মানদণ্ড। জীবনকে বিকশিত না করে যেমন ভাষার বিকাশ সম্ভব নয় তেমনি ভাষার বিকাশ ছাড়া আমাদের জীবনেরও বিস্তার অসম্ভব। অতএব পরস্পরকে ঋদ্ধ করার মধ্যেই এই প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।১৯

বাংলাভাষাকে বাদ দিয়ে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে চিন্তাও করতে পারি না। আমরা জন্মসূত্রে কোনো ভাষা নিয়ে আসিনি। এই দেশ, সমাজ, পরিবেশ ও পরিবার থেকেই ক্রমান্বয়ে ভাষা শিক্ষা করেছি। তাই বাংলার সঙ্গে দেশ, সমাজ, পরিবার এবং পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ওতপ্রোত সম্পর্ক বিদ্যমান। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হলো মাতার। জন্মের মানব শিশু প্রধানত: মায়ের কোলে লালিত পালিত হয় বলেই মায়ের মুখের ভাষাই তার মাতৃভাষা।২০

আমাদের অনুভূতি প্রকাশের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম প্রিয় বাংলাভাষার স্থান মূল শক্ত মাটিতে প্রথিত। অত্যন্ত ঝড়ো বাতাসে তার উৎপাটন সম্ভব নয়। বড়জোর ভাল পালা ভাঙতে পারে। সচেতন বাঙ্গালার সতর্ক পরিচর্যার জল সিঞ্চনে আবার খাড়া হয়ে দাঁড়াবে ভাষার গাছ। সংস্কৃতির ডালপালা গজাবে নতুন তেজে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামী হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন বাংলাভাষার ঐশ্বর্যকে প্রজন্মের কাছে উন্মোচন করা। কেননা বাংলা ভাষাই আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার।

কবির ভাষায়-
‘ মোদের গরব মোদের আশা
আ মরি বাংলা ভাষা।’

তথ্যনির্দেশ

১) অমর একুশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আল মুজাহিদী, দৈনিক ইনকিলাব, ২১ ফেব্র“য়ারি ২০০৩
২) একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবনা, এমাজ উদ্দীন আহমদ
৩) বিশ্বজয়ী বাংলা ভাষা এবং আমাদের দায়িত্ব, নিয়ামত হোসেন, দৈনিক জনকণ্ঠ, ২১ ফেব্র“য়ারি ২০০৮
৪) মাতৃভাষা মাতৃভূমি, মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, দৈনিক জনকণ্ঠ, একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০০৭

৫) ভাষা এক অপূর্ব নেয়ামত, মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ, যুগান্তর ২০ ফেব্র“য়ারি ২০০৪
৬) ভাষাচিন্তা প্রসঙ্গ ও পরিধি, মনসুর মুক্তা, বাংলা একাডেমী, জুলাই ১৯৯১
৭) প্রাগুক্ত
৮) একুশ মানে মাথা নত না করা, আবুল ফজল

৯) ভাষা শ্রেণী ও সমাজ, সভাপতির ভাষণ, অধ্যাপক রেহমান সোবহান
১০) ভাষার ইতিবৃত্ত, সুকুমার সেন, কলকাতা
১১) উচ্চতর স্বনির্ভর বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষা, ড. হায়াৎ মামুদ, জুলাই ২০০৩, দি অ্যাটলাস পাবলিশিং হাউস
১২) ভাষা প্রসঙ্গে বিতর্কের অন্তরালে, আহমদ শরীফ

১৩) মাতৃভাষা , মুনীর চৌধুরী
১৪) মধ্যযুগে বাংলা কাব্যের রূপে ও ভাষা, ওয়াকিল আহমদ, মে ১৯৯৪, বাংলা একাডেমী, ঢাকা
১৫) বাংলাদেশের ভাষা ও শ্রেণীর ভূমিকা: একটি দ্রুত দৃষ্টিপাত, আবু আবদুল¬াহ
১৬) ভাষা ও সংস্কৃতি, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

১৭) এই পৃথিবীর মানুষ, প্রথম খণ্ড, এ কে এম আমিনুল ইসলাম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৭
১৮) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মাতৃভাষার গুরুত্ব, মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রাক্তন ৪র্থ বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৭
১৯) প্রাগুক্ত

২০) তোমায় ভালবাসি, শান্তনু কায়সার, দৈনিক জনকণ্ঠ, অমর একুশে সংখ্যা ২০০৭
২১) মাতৃভাষা মাতৃভূমি, প্রাগুক্ত
২২) বাংলাভাষা চর্চার ঘাত-প্রতিঘাত, এগারো শতক থেকে একুশ শতক, এ কে এম শাহনাওয়াজ

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.