পার্সোনাল ব্রান্ডিংয়ের উপায়

আনিসুর রহমান এরশাদ

মানুষ রক্তমাংসের মানুষকে বিশ্বাস না করে বাঁচতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের তুলনায় মানুষকে বেশি বিশ্বাস করে। তাই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তির ব্রান্ডিংও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের রুচি-চাহিদা-দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত মানুষের কাছাকাছি যাবার পদ্ধতিও পরিবর্তন হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষের আকর্ষণ ধরে রাখতে, সার্ভিস টিকিয়ে রাখতে, সার্ভিসের স্থায়িত্ব বাড়াতে পার্সোনাল ব্রান্ডিং খুবই কার্যকরী।

পার্সোনাল ব্রান্ড

পার্সোনাল ব্রান্ড প্রচারের মাধ্যমে আপনাকে মানুষ সহজে চিনতে পারে, গুরুত্ব দিয়ে গ্রহন করতে পারে। এজন্য এমন কিছু পোট্রেইট তৈরি করতে হবে যাতে ব্যক্তিত্ব সুন্দরভাবে ফুটে উঠে। আপনার পোষ্ট করা  ছবিগুলো আপনার কাজের প্রতিচ্ছবি।যখনই সুযোগ আসবে সংক্ষিপ্ত সময়ে নিজেকে মূল্যবান হিসেবে উপস্থাপন করুন; নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখুন, নিজেকে গুছিয়ে রাখুন, উপস্থাপনের প্রয়োজনীয় কিছু নিজের কাছে লিপিবদ্ধ বা সংরক্ষণ করে রাখুন।

টার্গেটেড অডিয়েন্স

অডিয়েন্স ঠিক না করলে কখনই ব্রান্ডিং সফল হবে না। এমন প্রয়োজনীয় কন্টেন্ট তৈরি করুন যা টার্গেটেড অডিয়েন্স এর প্রয়োজন। এমন অফার প্রদান করুন যা তাদের সমস্যার সমাধান করবে। আকৃষ্ট করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি খুঁজুন। কোথায় তাদের খুজে পাওয়া যাবে তা বের করুন। সবসময় নতুন নতুন কিছু বিষয় শিক্ষার মন মানসিকতা রাখুন, কারণ পৃথিবীর প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। অডিয়েন্সের কাছে যত বেশি নতুন নতুন মূল্যবান বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে পারবেন ততই তাদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং আপনার ব্রান্ড প্রচার হবে।

অনলাইনে সহজপ্রাপ্য করা

পার্সোনাল ব্রান্ড প্রচার করার পূর্বে নিজেকে অনলাইনে যেন সহজে পাওয়া যায় তেমনভাবে প্রস্তুত করে তুলুন। অনলাইনে নিজেকে সহজপ্রাপ্য করে তুলুন। অনেকে গুগলে সার্চ করে বা সোশ্যাল প্রোফাইলগুলো দেখে। সঠিকভাবে ব্রান্ড প্রচারের জন্য নিজেকে অনলাইনে উপস্থাপন করুন; যা টার্গেটেড অডিয়েন্সের সাথে আপনাকে যুক্তও করবে। নিজেকে সহজে, সুন্দরভাবে এবং প্রফেশনাল উপস্থাপন করতে পার্সনাল ওয়েবসাইট তৈরি করুন। এতে নিজের দক্ষতা, পূর্বের ক্লায়েন্ট, তাদের রিভিউ, সার্ভিস চার্জসহ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন। নতুন নতুন গ্রাহক তৈরির সম্ভাবনা বাড়ে।

 অনুপ্রেরণা

নিজের সফলতার গল্পগুলো ব্যখ্যা করুন, কিভাবে শুরু করলেন, কতটুকু কষ্টের পরে আপনার সফলতা তা সবার সাথে শেয়ার করুন। এতে হয়ত আপনি হয়ে যেতে পারেন নতুনদের অনুপ্রেরণা।

মার্কেটিং

পার্সোনাল ব্রান্ড সুন্দরভাবে মার্কেটে উপস্থাপন করতে হলে একটি মার্কেটিং স্ট্রেটেজী থাকা উচিত। কিভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করবেন?

স্ট্রেটেজী তৈরি

কিভাবে পোস্টিং করবেন কখন পোস্টিং করবেন? কিভেবে এঙ্গেজমেন্ট বৃদ্ধি করবেন? কন্টেন্ট তৈরি, তা কিভাবে শেয়ার হবে এবং সেই কন্টেন্ট কিভাবে প্রচার করা হবে তার একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করুন। কোথায় গেস্ট ব্লগিং করবেন, কোন কোন বিষয়ের উপর গেস্ট ব্লগিং করবেন তার একটি স্ট্রেটেজী তৈরি করুন।

 গুরুত্ব তৈরি

ছোট ছোট ভিডিও বানিয়ে শেয়ার করুন নিজের অভিজ্ঞতা, নতুন নতুন জানার বিষয়গুলো; যা সবার কাছে আপনার গুরুত্ব তৈরি করবে।  কার্যকর জনসংযোগ বাড়িয়ে দুর্নাম এড়ান, সুনাম বয়ে আনুন। পরিবারিক দুর্নাম থাকলে পরিবারের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার জন্যে ইতিবাচকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরুন।

স্বপ্নলোকের বাসিন্দা না হয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশুন, সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসুন, কথা বলুন, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিন, ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলুন, খেলায় অংশ নিন, প্রার্থনায় শরিক হোন, সেমিনার- সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করুন এবং মুক্তহস্তে দান খয়রাত করুন ; দেখবেন চমৎকার ভাবমূর্তি গড়ে উঠছে, জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়া সহজ হচ্ছে।

কর্মপ্রয়াস

মনে রাখতে হবে পার্সোনাল ব্রান্ডিং হচ্ছে- একটি সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত বিরামহীন কর্মপ্রয়াস। যার লক্ষ্য বক্তি সর্ম্পকে জনগণ, স্টেক হোল্ডার তথা টার্গেট গ্রুপের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির  ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটিয়ে পারস্পরিক সমঝোতা বা সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। একটি ভালো বার্তা যেমন জনগণের কাছে পোঁছে ব্যক্তি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে ঠিক তেমনি একটি ভুল বার্তা ব্যক্তির দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনামকে ধূলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। তাই হতে হবে চৌকস, বিচক্ষণ ও প্রো-অ্যাকটিভ।

পরিচিতি বাড়ানো

পার্সোনাল ব্রান্ডিং মূলত আপনার নিজের ব্যক্তি পরিচিতি গড়ে তোলা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর।লোকে আপনাকে না চিনলে কেন আপনার কাছে আসবে? কি দরকার আছে তার? লোকের সাথে পরিচিতি বাড়ানোটা উদ্যোগক্তার জন্য সবচেয়ে দরকার। এই বিষয়টি বিদ্যামান প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করবে।

পার্সোনাল ব্রান্ডিং গড়ে তুলার উপকারিতা হলো- বিশ্বাস যোগ্যতা তৈরি করে, মিডিয়া কাভারেজ পান, নেটওয়ার্ক তৈরিতে সাহায্য করে, অতিরিক্ত অডিয়েন্স আর্কষণ করে, একটা প্ল্যার্টফম তৈরি করতে সাহায্য করে, অডিয়েন্সদের নিয়ে আলাদাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।

পার্সনাল ওয়েবসাইট

পার্সোনাল ব্রান্ডিং এর কার্যকর উপায় হচ্ছে- শেখা ও জানার ভিত্তি মজবুত করুন। টার্গেট অডিয়েন্স খুঁজে বের করুন। গ্রহনযোগ্য অফার তৈরি করুন। পার্সনাল ওয়েবসাইট অপটিমাইজ করুন। কৌশলগতভাবে কন্টেন্ট তৈরি করুন। দৃশ্যমান কৌশল গ্রহন করুন। ইন্টারভিউ দিন বা নিন। পাবলিক স্কিপিকিং করুন। একটা কমিউনিটি তৈরি করুন। নেগেটিভ ব্রান্ডিং যাতে না হয় খেয়াল রাখুন।

লেখালেখি ও ভিডিও

পার্সোনাল ব্র্যান্ড হিসাবে তৈরি করার জন্য ভালোবাসা থেকে লিখুন। জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলুন। নিজেকে ব্র্যান্ড হিসাবে তৈরি করার ভালো মাধ্যম হল প্রত্যেকদিন লেখালেখি করা বা ভিডিওতে তুলে ধরা। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এ্যাক্টিভিটি যাতে থাকে। যারা সোস্যাল মিডিয়াতে ফলো করে, তাদেরকে জানতে দিন প্রতিটা দিন সময়গুলো কিভাবে কাটে, আপনার ভালোলাগা, খারাপ লাগা, আপনার কাজ। প্রত্যেকদিন যদি ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করতে পারেন তার সুফল অনেক। মনে রাখবেন- একটা ৫০০ ওয়ার্ডের আর্টিকেল = ১ টা পিকচার, ১০০ টা পিকচার = ৫ মিনিটের একটা ভিডিও। ছোট ছোট রেকর্ড বানান। ইউটিউবে ভিডিও বানান।

নিয়মিত পোস্ট

ফেসবুকে প্রত্যেক দিন নতুন কিছু আপডেট দিলে বা পোস্ট করলে ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়ে । ফেসবুক মেইলের থেকেও বেশি কার্যকর; কারণ ই-মেইলে দিলে স্প্যামে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।ফেসবুক পেজের থেকেও ফেসবুক গ্রুপগুলো বেশি মাত্রায় ইন্টারএ্যাক্টিভ হয়। খারাপ লাগা প্রকাশ করতে শিখুন। পরিবার সম্পর্কে জানান। ভুলগুলো শেয়ার করার পর দেখবেন আপনার ভাবা সমাধান থেকেও অনেক ভালো সমাধান আপনাকে ফলো করে এমন অনেকেই দিচ্ছে।

প্রফেশনাল চিন্তা

চেষ্টা করুন প্রফেশনাল চিন্তা করার। অনুরোধে ঢেকি গেলার অভ্যাসটা ত্যাগ করুন। যে কাজ পারেন না ঐ কাজে ‘পারি না’ বলুন। ভিন্ন কিছু করুন। যা আছে তা আরো ডেভেলপ করুন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে গেলে ঐ জায়গার একটা বর্ণনা ও ছবি দিন। কেউ পোস্ট কমেন্ট করলে উত্তর দিন। নিজের সম্পর্কে কথা বলুন। আর্টিকেল লেখার সময় ভাল গ্রহণযোগ্য সোর্স উল্লেখ করুন; এতে আর্টিকেলের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাবে।

অভিজ্ঞতা শেয়ার

পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে আপনাকে শুধু নিজের ব্যবসার প্রচার করলেই চলবে না।  তাহলে কিন্তু ফলোয়ার বা ভক্তরা আপনার কথাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেবে না। আপনাকে পুরো ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কথা বলতে হবে। নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে হবে। এর বাইরেও নিজের ব্যক্তিগত ভাবনা, বিভিন্ন ইস্যু ও সামাজিক বিষয় নিয়ে নিজের মতামত, ও নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে হবে, পোস্ট করতে হবে।

আত্মপ্রচার

বাগানে ফোটা নতুন ফুলটি নিয়ে পোস্ট দিতে হবে, বাচ্চার নতুন দুষ্টুমি নিয়ে পোস্ট দিতে হবে। ফলোয়াররা যেন আপনাকে আপন ভাবতে পারে। একটি ব্যবসা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে নিজের প্রচার করুন। মানুষ কোম্পানীকে নয়, মানুষকে বিশ্বাস করে। আত্মপ্রচারের পেছনে সময় দেয়াটাও কার্যকর বিনিয়োগ। সফল আত্মপ্রচারের ফলে যেমন আপনার ব্যবসার প্রসার বাড়বে, তেমনি নতুন নতুন ব্যবসায়ে তাড়াতাড়ি সফল হওয়ার পথও সুগম হবে।

 

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *