ক্ষমতাধর চৌকস নেতা পুতিনের রহস্যময় জীবন

আনিসুর রহমান এরশাদ

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার সুপারহিরো। তাকে চেনে না এমন মানুষ বোধহয় কমই আছে। প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল মানুষটি নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। আত্মপ্রত্যয়ী পুতিনের জীবনযাপন বিলাসিতা, অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে এক রাজকীয় ব্যাপার। পুতিন নিজেকে আলাদাভাবে গড়ে তুলেছেন। ব্যক্তিত্ব, কাজকর্ম, চিন্তাভাবনায় তিনি বিশ্বের আর দশজন নেতার মতো নন। জুডোতে তার ব্ল্যাক বেল্ট আছে।

অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পুতিনকে দেখা যায়, মার্শাল আর্ট ও আইস হকির অনুশীলনে, সাইবেরিয়ার দক্ষিণে হ্রদে খালি গায়ে বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করতে, শিকারের পর বড়শি ও মাছ হাতে ধরে ডাঙায় ফিরতে, পাহাড়ি হ্রদে দাপিয়ে বেড়াতে, ডুবুরির পোশাকে গভীরতম হ্রদের তলদেশে ঘুরে বেড়াতে, স্পিডবোট নিয়ে লেকের জলে ঘুরে বেড়াতে, লেকের ধারে বিশ্রাম নিতে, দূরবীনের সাহায্যে দূরের পাহাড় দেখতে, কাঠের সেতু হেঁটে পার হতে, জঙ্গলে সামরিকবাহিনীর ট্রাক চালাতে, পাহাড়ে হাইকিং করতে, সাঁতার কাটতে, সূর্যস্নান করতে, জিমে ব্যায়াম করতে ও উদাম গায়ে দক্ষ ঘোড় সওয়ার হতে। তিনি ডুবুরি হয়ে সমুদ্রের নিচে প্রাচীন শহরের সন্ধান করেন, কৃষ্ণ সাগরের তলদেশে নিজেই সাবমেরিন চালিয়ে অভিযান চালান।

আনপ্রেডিক্টেবল পাওয়ারফুল ম্যান

পুতিনতো এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। সবচেয়ে আনপ্রেডিক্টেবল পাওয়ারফুল ম্যান। বিশ্বমঞ্চে পুতিনের জয়জয়কার। কারণ তিনি বিশ্বব্যবস্থাকে বোঝেন। কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করতে হয় তা জানেন। মুক্ত সমাজের দুর্বলতা জানেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতা সম্পর্কেও জানেন। তিনি মার্কিনিদের খুব ভালো করেই বোঝেন। তার প্রচেষ্টায় শৌর্যবীর্যে ফিরেছে রাশিয়া।

মস্কোর প্রভাববলয় ক্রমেই বাড়ছে। রাশিয়াকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে আনছেন। বিশ্বমঞ্চে রাশিয়া নামডাক ও সম্মান বাড়িয়েছেন। বৃহত্তর রাশিয়া গড়ার পথে রয়েছেন। ইউরোপের সীমানা বদলানোর বিষয়ে বরাবর সোচ্চার তিনি। পৃথিবীর নতুন মানচিত্র বানাতে চান। যেন পুরো বিশ্বের রাজনীতি পকেটে পুরে নিয়েছেন পুতিন।

কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

পুতিন রাশিয়াকে বোঝেন। তিনি রাশিয়ায় ক্ষমতার এমন এক কাঠামো গড়ে তুলেছেন, যেখানে তিনিই সর্বেসর্বা। রাশিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার পুরো কাঠামোটি পুতিনের ওপর নির্ভরশীল। পুতিন নিজ দেশের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাশিয়া পুনর্গঠন করছেন। দেশে আইনের শাসন প্রবর্তন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছেন। জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেছেন। জিডিপি বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমিয়ে এনেছেন।

রাশিয়ায় নেতা মানেই পুতিন

সরকারি বাণিজ্য ডিজিটালাইজড করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের সংযোগ ছড়িয়ে দিয়েছেন। পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার করেছেন। দেশের বাইরে যুদ্ধ চালিয়েছেন, ইউক্রেনের একটি অংশ দখল করে রাশিয়ার সীমানা বাড়িয়েছেন। অঙ্গরাজ্যগুলোর অখণ্ডতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। রাশিয়া জ্বালানি খাতে বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আণবিক শক্তিতে নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো বৃহৎ রপ্তানি সহায়ক পাইপলাইনের মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। রাশিয়ায় পুতিনের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। বলা যায় তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। রাশিয়ায় এখন নেতা মানেই পুতিন।

সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি পুতিন

সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেননি পুতিন। পরিবেশ-পরিস্থিতিই তাকে দৃঢ়চেতা করেছে। সাফল্যকে মুঠোবন্দী করার কৌশল জীবন থেকেই শিখেছেন তিনি। ১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে তার জন্ম। সেন্ট পিটার্সবার্গ এলাকাতেই পুতিনের শৈশব কেটেছিল। সেন্ট পিটার্সবার্গের ভবনগুলোর সিঁড়িতে দৌড়াদৌড়ি করে ইঁদুর মারতেন পুতিন।

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের বাড়িতে দীর্ঘদিন শেফের কাজ করতেন পুতিনের দাদা। পরে যখন স্টালিন রাশিয়ার ক্ষমতায় আসলে তারও রান্নার কাজ করতেন তিনি। পুতিনের বাবা অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ ছিলেন। ছিলেন সিকিউরিটি গার্ড। তিনি পুতিনের শুধু ভুল ধরতেন আর বকাঝকা করতেন। পুতিনের মা মারিয়া শিলোমোভা দয়ালু ও নরম মনের মানুষ ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত লেলিনগ্রাদের স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার প্রতি তেমন একটা আগ্রহী ছিলেন না। অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর তিনি হাইস্কুলে ভর্তি হন। হাইস্কুলটি ছিল রসায়ন বিদ্যায় বিশেষ প্রাধান্য দেয়া একটি প্রযুক্তি শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৭০ সালে পুতিন এখান থেকে পাশ করে লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে আইন অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

কর্মজীবন

এরপরই পুতিন রাশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী কেজিবিতে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৭৬ সালে। কেজিবিতে গোয়েন্দা প্রতিরোধ কর্মকাণ্ডে কাজ করতেন। ১৯৮৫-১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানির সোভিয়েত কনস্যুলেটে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি কেজিবি’র লেফটেন্যান্ট কর্নেল র‌্যাংক অর্জন করেন। ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে অবসর নেন।

১৯৯১ সালের জুনে সেইন্ট পিটার্সবার্গ সিটি হল এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হন। ১৯৯৪ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রশাসনের প্রধানের প্রথম ডেপুটি হিসেবে কাজ শুরু করেন। জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের সহকারী প্রধান হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে ১৯৯৬ সালে সপরিবারে মস্কোতে চলে যান। ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক অফিসের সহকারী চিফ অব স্টাফ এবং প্রধান নিয়ন্ত্রক দপ্তরের প্রধান হন।

১৯৯৮ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক দপ্তরের প্রধান চিফ অব স্টাফ হিসেবে পদোন্নতি পান এবং জুলাইয়েই ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সালের মার্চ থেকে রাশিয়ান ফেডারেশানের নিরাপত্তা বিষয়ক কাউন্সিলের সচিব হন। ১৯৯৯ সালের আগস্টে রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হন আর ৩১ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

২০০০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ২০০৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ থেকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে অবস্থান ও রাশিয়াকে নতুনভাবে জাগ্রত করছেন পুতিন। রাজনীতিটা বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন এবং এখনতো সবাইকে খেল দেখাচ্ছেন।

বই পড়েন পুতিন

অবসর পেলেই বই পড়েন পুতিন। তবে গোয়েন্দা কাহিনী পড়তে বেশি পছন্দ করেন। এ সম্পর্কে পুতিন বলেন, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত ও মুগ্ধ করে ওই বিষয়টি, যখন কোনো একটি কাজ পুরো সেনাবাহিনী মিলে করতে পারে না, অথচ সেই কাজই করে ফেলেন গুটিকয়েক ব্যক্তি।’

ভাষা

পুতিন খুব ভালো ইংরেজি জানেন। যদিও ইংরেজিতে কথা বলতে তিনি একদমই পছন্দ করেন না। রুশভাষী পুতিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জার্মান ভাষায়ও কথা বলতে পারেন। বাড়িতে তিনি ও তার পরিবার জার্মান ভাষায় কথা বলে থাকেন। প্রেসিডেন্ট হবার পর তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি এখন স্পষ্ট ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইংরেজি ভাষা প্রয়োগ করেন।

কঠোর পরিশ্রমী পুতিন

কঠোর পরিশ্রমী পুতিন ক্যামেরার সামনে থাকতে খুব পছন্দ করে, বিশেষ করে এমন চরিত্রে যেখানে তাকে নায়ক মনে হবে। তিনি স্টান্ট বেশ পছন্দ করেন এবং দুর্লভ প্রাণিদের রক্ষার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে ভালোবাসেন। পুতিন তিমির এবং বাঘের মুখ থেকেও টেলিভিশন ক্রুকে রক্ষা করেছিলেন।

বিয়ে ও পরিবার

১৯৮৩ সালের ২৮ জুলাই পুতিনের সঙ্গে বিয়ে হয় কালিনিনগ্রাদে জন্মগ্রহণকারী ও সাবেক বিমানবালা লুদমিলা আলেকজান্দ্রোভানা ওকেরেত্নায়ার। লুদমিলার জন্ম ১৯৫৮ সালের ৬ জানুয়ারি। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উভয়ে জার্মানিতে বসবাস করেন। তাদের সংসারে দুই মেয়ে ইকাতেরিনা ও মারিয়া। পুতিনের দুই কন্যার নামই তাদের তাদের দাদী ও নানীর সম্মানে রাখা। মারিয়া (পুতিনের মা) ইকাতেরিনা (লুদমিলার মা)।

ছোট মেয়ে মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রশাসনে উচ্চপদে চাকরি করেন। বড় মেয়ে একজন শিক্ষাবিদ। লুদমিলাকে বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর মারধর করতেন তিনি। তাদের মধ্যে খুব কম কথা হত। প্রায় তিন দশক ধরে সংসারিক জীবনের পর ডিভোর্সের ঘটনা ঘটে। ২০১৩ সালের জুনে পুতিন ও লুদমিলা আলাদা হয়ে যান। পুতিনের এক কম বয়সী মহিলার সাথে পরকীয়া থাকার গুজব ছিল। লুদমিলার অভিযোগ ছিল, পুতিন শুধুই কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন। কাজই ছিল তার নেশা।

পুতিনের গোপন প্রেমিকা

পুতিনের গোপন প্রেমিকা সুন্দরী নারী অ্যালিনা কাবায়েভা অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী সাবেক জিমন্যাস্ট। জন্ম ১৯৮৩ সালের ১২ মে। দুটো অলিম্পিক পদক ছাড়াও ১৪টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পদক ও ২৫টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ পদক জিতেছেন। ২০০৫ সালে জিমন্যাস্টিক থেকে অবসর নেয়ার পর কাবায়েভা হয়ে যান পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সংসদ সদস্য।

ক্রেমলিনমুখী একটি বড় মিডিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান বানানো হয় তাকে। শীতকালীন অলিম্পিকে তিনি অলিম্পিক মশাল বহন করেন। রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে কাবায়েভার জন্মদিন পালন উপলক্ষে তার উপর নির্মিত স্তুতিমূলক ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়েছে। যার কফি কিনতে মধ্যরাতে মেশিনগান হাতে বুলেট-নিরোধক পোশাক পরিহিত সৈন্যদল পাহারা দেয়। রাশিয়ার অঘোষিত এই ফার্স্টলেডিকে কমই প্রকাশ্যে দেখা যায়।

কাবায়েভা ১৯৮৩ সালে উজবেকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। পুতিনের আশীর্বাদে তিনি এখন বহু সম্পদের মালিক। ২০০৯ সালে কাবায়েভা পুতিনের এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। ২০১২ সালে এক কন্যা সন্তানের জন্মের খবর প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে যমজ সন্তানের মা হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।

শরীরের ফিটনেস রক্ষা

পুতিন নিজের বুড়িয়ে যাওয়া নিয়ে বেশ আতঙ্কিত। তারুণ্য জিইয়ে রাখতে নিয়মিত শরীরচর্চা, ব্যায়াম ছাড়াও গরম ও ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করেন তিনি। তিনি কপাল ও চোখের নিচের চামড়ার ভাঁজ হয়ে যাওয়া রোধে কিছুটা পরিবর্তন আনিয়েছেন। শরীরের দাগ ও চামড়ার ভাঁজ কমাতে ওষুধ নিচ্ছেন। নিয়মিত ব্যায়াম করে শরীরের ফিটনেস রক্ষা করেন। আঠারো বছর বয়সেই পুতিন জুডোতে ব্ল্যাক বেল্ট অর্জন করেন। এখনো তিনি প্রায় প্রতিদিন মার্শাল আর্ট অনুশীলন করেন।

দৈনন্দিন জীবন-যাপন

পুতিন দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। ‘কটেজ চিজ’ নামে পনির থাকে সকালের নাশতায়। কোয়েলের ডিম ও ফলের রস খেতে পছন্দ করেন। সকালে নাশতার পর সাঁতার কাটার জন্য সুইমিং পুলে নামেন। পরেন সাঁতার কাটার চশমা। সাধারণত ক্রলিং স্টাইলে সাঁতার কাটেন। সাঁতারের পর জিমে সময় কাটান। বিভিন্ন ব্যায়াম শেষে গরম ও ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করেন।

তিনি ইন্টারনেট পছন্দ করেন না। তার অফিসে টেলিভিশনও নেই। যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। এখনো কাগজেই কাজ করেন। ব্যবহার করেন সোভিয়েত যুগের ল্যান্ড টেলিফোন লাইন। বিদেশ ভ্রমণের সময় নিরাপত্তার খাতিরে তার সঙ্গে থাকে নিজস্ব বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও ওয়েটার। হোটেলে থাকার সময় তার সঙ্গে থাকা লোকজন হোটেলের সব কাগজ ও প্রসাধনী দ্রব্য সরিয়ে ফেলে সেখানে অনুমোদিত সামগ্রী রেখে দেন। আর ক্রেমলিনের অনুমোদন ছাড়া তিনি কোনো বিদেশি খাবার খান না।

পছন্দ-অপছন্দ

মস্কোর বাইরের একটি স্থানে বাস করেন। জায়গাটা গোপনীয়। এর কারণ, তিনি যানজট, দূষণ ও মানুষের ভিড় অপছন্দ করেন। তিনি তার সরকারি দফতর ক্রেমলিনে যেতেও পছন্দ করেন না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রতিদিনই কোনো না কোনো আলোচনা সভা, বৈঠক ও কনফারেন্সে যান পুতিন। যেখানেই যান সঙ্গে তার দেহরক্ষী থাকলেও একজন সঙ্গী কিন্তু থাকবেই। আর সেই সঙ্গী হল তার প্রিয় পোষা কুকুর কনি।

 সম্পদশালী পুতিন

পুতিনের নিয়ন্ত্রণে যেসব সম্পদ রয়েছে তার বেশিরভাগই দেশটির বিভিন্ন তেল ও গ্যাস কোম্পানীতে শেয়ার আকারে রয়েছে। রাশিয়ার তেল কোম্পানী সারগুনেফটেগাজ এর ৩৭ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করেন পুতিন। জ্বালানি খাতের আরেক শীর্ষ কোম্পানী গ্যাজপ্রম এ পুতিনের রয়েছে সাড়ে চার শতাংশ শেয়ার। এছাড়া গুনভর কোম্পানীতেও পুতিনের শেয়ার আছে।

 বিলাসী পুতিন

বিত্ত-বৈভবে ভরপুর পুতিনের বিলাসী জীবন। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ আছে ৪৩টি। কয়েকটি ব্যক্তিগত বিমানের সাজসজ্জা চোখ ধাঁধানো। অনেকগুলোর অন্দরমহল সাজানো হয়েছে স্বর্ণ দিয়ে। ব্যক্তিগত বিমানের টয়লেটও সোনার পাতে মোড়ানো, ৭৫ হাজার ডলারের টয়লেট ব্যবহার করেন। বিমানেই আছে জিম এবং বিরাট সাইজের পালঙ্কও। পুতিনের বিমানের গতি ঘণ্টায় ১০৩৫ মাইল। পুতিনের।

বাথরুমের সিঙ্কটিও সোনার পাত দিয়ে বাঁধানো। ক্লান্ত পুতিনের শোয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিরাট সাইজের এক পালঙ্ক। সবকিছু সাজানো-গোছানো আর পরিপাটি। রয়েছে একটি ব্যায়ামাগারও। আধুনিক সব ব্যায়ামের যন্ত্র দিয়ে সাজানো এটা। শরীরটাকে ফিট রাখতে নিয়মিতই ব্যায়াম করেন পুতিন। দেশের বাইরেও যাতে বাদ না যায় তার সুব্যবস্থাই রয়েছে বিমানের মধ্যে। এছাড়া ১৫টি হেলিকপ্টার আছে, যেগুলোর মধ্যে এমআই-এইট নামে বিশেষ ধরনের এক হেলিকপ্টার তৈরি হয় শুধু পুতিনের জন্য।

হাতের ঘড়িতেও আছে বিলাসিতার ছাপ। জার্মানের বিখ্যাত ব্র্যান্ড অ্যা লাঙ্গে শোয়েনের তৈরি মাস্টার পিসখ্যাত টার্বোগ্রাফ নামক ঘড়িটি পুতিনের হাতে দেখা গেছে বেশ কয়েকবার, যার বাজারমূল্য ৫ লাখ ডলার। কতটা শৌখিন হলে এত দামের ঘড়ি ব্যবহার করেন! পুতিনের সংগ্রহে আছে সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্যাটেক ফিলিপের তৈরি পারপিচুয়্যাল ক্যালেন্ডার সিরিজের ঘড়ি, যার বাজারমূল্য ৬০ হাজার ডলার। একই ব্র্যান্ডের ক্যালাট্রাভা সিরিজের ১৮ হাজার ডলারের ঘড়িও রয়েছে।

চার-চারটি প্রমোদতরীর মালিক পুতিন। একটি উপহার পেয়েছেন রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে। পুতিনের সবচেয়ে প্রিয় প্রমোদতরীটি ১৭৫ ফুট লম্বা, যার দাম ৩৭ মিলিয়ন ডলার। তার গাড়ির সংখ্যা ৭০০। বিশ্বের নামিদামি সব ব্র্যান্ডের গাড়ি আছে। আছে ফর্মুলা ওয়ানের মতো বিলাসবহুল গাড়িও। তবে পুতিন প্রিয় গাড়ির তালিকায় রাশিয়ায় তৈরি গাড়িগুলোকেই এগিয়ে রেখেছেন।

রাশিয়াজুড়ে ২০টির মতো বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন তিনি। কৃষ্ণসাগরের পাড়ের বিশাল প্রাসাদোপম গোপন বাড়ির দাম এক বিলিয়ন ডলার। পুতিন’স প্যালেস এলাকায় হেলিপ্যাড, ওয়াইন স্টোর, স্পা, ক্যাসিনো, থিয়েটারগুলি ছাড়াও বিলাসিতার সমস্ত কিছু রয়েছে। গ্রেসফুল নামের ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিলাবহুল সুপার ইয়টেরও মালিক পুতিন। মস্কো শহরে একটি সুসজ্জিত তিনতলা বাড়িও রয়েছে পুতিনের। স্পেনের লা জাগালেতায় একটি অত্যাধুনিক বিলাসবহুল প্রাসাদ রয়েছে। স্পা, জিম, পিয়ানো বার, সিনেমাহল, ঝরনার সঙ্গে জিব্রালটার উপত্যকার অসাধারণ দৃশ্য।

দেশটির ধনিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে পুতিনের জন্য উপহার হিসেবে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ১৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে মনোরঞ্জনের জন্য স্ট্রিপটেজ পোল, উজ্জ্বল সবুজ রঙের টেবিলসহ ক্যাসিনো, আর্কেড এবং টয় কারের জন্য রেস ট্র্যাকসহ একটি কক্ষ রয়েছে। রয়েছে গ্রিস থেকে আনা প্রাচীন অর্থোডক্স চ্যাপেল। কৃত্রিম গুহায় হকি রিঙ্ক এবং ওয়াইন টেস্টিং রুম। মাটির নিচে রয়েছে ১৬ তলার বাঙ্কার।

পাথর কেটে তৈরি গোপন টানেল কৃষ্ণসাগরে ব্যক্তিগত ডক পর্যন্ত গেছে। রয়েছে সশস্ত্র রক্ষীদের চেকপয়েন্ট। একটি হেলিপ্যাড। ১৯ হাজার ৩০০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত প্রাসাদ। ‘দ্য রাশিয়ান রিভিরা’র গেলেদঝিক শহরের বাইরে পাহাড়ি বনভূমিতে এর অবস্থান। প্রাসাদে আইস হকি করার জন্য একটি স্টেডিয়াম এবং একটি গির্জাও রয়েছে। রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থা ওই প্রাসাদের চারপাশে ৭৭ বর্গকিলোমিটার জমি নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রাসাদটি নো ফ্লাই জোনে। স্থল, আকাশ পথে কিংবা জল পথের মাধ্যমে এই প্রাসাদে পৌঁছানো যায় না। প্রাসাদে কর্মরত কোনো কর্মচারী ক্যামেরা বহন করতে পারে না।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *