আমি মানি না বলতে শিখুন : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

‘নেতারা কারো কথা মানে না। কারণ নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, আমি মানি না বলতে পারা। নেতা শুধু একজনের কথাই মানে। নেতা শুধু মানে নিজেকে। সেই মানুষই নেতৃত্বে দাঁড়াতে পারে যে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে। যেমন গৌতম বুদ্ধ জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। নেতারা কারো মতো হয় না। তারা আলাদা। অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

নেতৃত্ব কোনো স্বাভাবিক মানুষের কাজ হতে পারে না। নেতৃত্ব মানেই হলো পাগলামি। কী হবো? কীভাবে হবো? কবে হবো? এসব হিসেবের মধ্যে নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হলে হিসেবের বাইরে যেতে হয়। যখনই কেউ জীবনকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেয় তখনই তিনি নেতা হয়ে যান।

সাফল্য খুব ক্ষুদ্র কাজ। সাফল্য মানে হলো দক্ষতা। আর দক্ষতা যে কেউ অর্জন করতে পারে। কোনো নেতা সাফল্য অর্জন করার জন্য আগ্রহী হয় না। নেতারা শুধু সার্থকতা অর্জন করতে চায়। সার্থক জীবনের স্বপ্ন দেখাই হয় নেতাদের জীবনের লক্ষ্য।

সস্তারই বেশি বিড়ম্বনা থাকে। কারণ সস্তা হলেই তার গ্রাহক বেশি থাকে। সস্তা হলেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। যে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাতে পারে সে কখনোই অসাধারণ নয়।

জনপ্রিয়তা খুবই নিম্নশ্রেণির জিনিস। জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী। অমরত্ব দীর্ঘস্থায়ী। জনপ্রিয়তা একটা বাজারের বিষয়। অধিকাংশ সময় এটা ব্যবসায়ের বিষয়ও। মানুষের চাইতে মানবতার দিকে আমার আগ্রহ বেশি।

অ্যাবস্ট্রাকশনের দিকে আমার ঝোঁক বেশি, আইডিয়ার দিকে ঝোঁক বেশি। ব্যক্তি মানুষের চেয়ে সিস্টেম, অর্গানাইজেশনাল ফর্মের দিকে আমার আগ্রহ অধিক। এক হাজার মানুষের সামনে আমি বক্তৃতা করতে পারব, কিন্তু একটা মানুষের সামনে ওই আনন্দ নিয়ে কথা বলতে কেন যেন সঙ্কোচ বোধ করি।

মানুষ সাহসীদের নেতা বানায়। তুমি যদি সাহস করে মানুষের অধিকারের কথা বল, তাদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করো তারা নিজেরাই তোমাকে তাদের নেতা বানাবে। যে মানুষের সঙ্গে অনেক মানুষ আসে সে হলো নেতা। মানুষকে ভালোবাসলে হৃদয়ে বেদনা তৈরি হয়। বেদনা থাকলে নেতৃত্ব প্রতিভা নিজে থেকেই তৈরি হয়।

নেতা হতে হলে সবার আগে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। এমন একজন যার নির্দেশ শোনামাত্রই সবাই তা মেনে নেয়। নেতা হতে পারে সাহসীরাই। ভীরু মানুষ নিজেকে খুব মূল্যবান মনে করে। তাই সে সব সময় নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। এ ধরনের মানুষের মাধ্যমে মুক্তি আসে না। অন্যদিকে সাহসীরা নিজেদের মূল্যবান মনে করে না। অন্যের জন্য জীবন সঁপে দেয়। তারাই প্রকৃত নেতা।

বর্তমান প্রজন্মকে নেতৃত্ব নিতে হলে সাহসী হতে হবে। নেতৃত্ব রাজপ্রাসাদ থেকে আসে না। নেতৃত্ব  তৈরি হয় মাটি, ঘাস ও দুঃখ-বেদনা থেকে। ভোগ, লোভ ও অহমিকা একজন নেতার নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দেয়।

তুমি যা হতে চাইছ বা হওয়ার স্বপ্ন দেখছ, সেটা হতে পারাটাই সার্থকতা। একসময় যখন আমি যে কাজই করতাম, সেই কাজটা পাগলের মতো করতাম একেবারে চাঁদে পাওয়া মানুষের মতো। এক কাজ নিয়েই পড়ে থাকতাম। কিন্তু একই সঙ্গে এখন আমি সাত রকমের কাজ করতে পারি। এটা বয়স ও অভিজ্ঞতার ব্যাপার। আর এই সাত রকম কাজের মধ্যে যে বৈচিত্র্যের আনন্দ, সেটা আমার অল্প বয়সের মধ্যে ছিল না। তখন যেটার মধ্যে প্রথিত হয়ে যেতাম, সেটার মধ্যেই আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকতাম।

সিসেরো বলেছেন, বেঁচে থাকাটাও একটা সার্থকতা। বৃদ্ধ হওয়াটাও একটা যোগ্যতা। আমি মনে করি, এই কথার মধ্যে সত্যতা আছে। বৃদ্ধ হতে গিয়ে মানুষ যে বহু রকমের তথ্য, জ্ঞান ও বিজ্ঞতা অর্জন করে, সেটা অল্প বয়সে কিছুতেই সম্ভব নয়। এটা হলো একটা কথা। আরেকটা কথা হলো, সারা জীবন মানুষ যা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, বার্ধক্য তো তা-ই।

একজন লেখক যদি জনবিচ্ছিন্ন থাকেন তাহলে তিনি কখনোই ভালো লেখক হবেন না। মানুষের কটু সাহচর্য, সুখ-দুঃখপূর্ণ সান্নিধ্য তাকে পেতে হবে। এবং জগতের সমস্ত দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হবে এবং এটা সে যত বিশ্বস্ততার সঙ্গে করতে পারবে ততই তার কল্পনাশক্তি বাড়বে এবং একই সঙ্গে সে বাস্তব ও কল্পনাকে দাঁড় করিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারবে।

বই পড়লে যোগ্যতা অর্জন করা যায়। যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে সমাজ রাষ্ট্রসহ সব জায়গায় আলোকিত মানুষ হওয়া সম্ভব। আর এজন্য সবাইকে বই পড়িয়ে আলোকিত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। বই পড়া মানুষ তাদের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে পারে। নানা ক্ষেত্রে অবদান রাখার মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে পারে দেশের উন্নয়নে। পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বই পড়তে হবে। এতেই নিজেকে বিকশিত করা সম্ভব।

বাংলাদেশের বারডেম হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইব্রাহিম। তিনি একদিন দেখলেন, ছোট্ট একটি শিশু ডায়বেটিসে মারা গেল। তার চোখে পানি চলে আসে। এতো ছোট একটি শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে! ডা. ইব্রাহিম যেদিন এ ঘটনা দেখলেন; সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন- যদি তিনি বেঁচে থাকেন তাহলে ডায়বেটিস রোগীদের জন্য এমন একটি হাসপাতাল তৈরি করবেন, যেখান থেকে হাজার হাজার মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। এ জন্য যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয় তিনি করবেন এবং তিনি জীবন উৎসর্গ করে দিলেন। ঠিক যখনই তিনি জীবনকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখনই তিনি নেতা হয়ে গেলেন। তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সামান্য একজন ডাক্তার ছিলেন।

তরুণের রক্ত ব্যবসায়ীদের কাছে খুব প্রিয়, তাই এখন চারদিকে তারুণ্যের ফল্গুধারা। কিন্তু, ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করে, তাদের সব রক্ত শুষে নেয়, এরপর তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আমাদের তরুণরা যে সামনে এগুবে সে পথটি কেউ তৈরি করছেন না। কারণ আগামীর পথ দেখানোর মানুষটি এখন আর খুব দেখা যায় না। যারা আছেন তারা শুধু বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় নয়, জীবনাচার দিয়ে তরুণদের উৎসাহিত করতে হয়।

রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, শেরেবাংলা ও বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি বাঙালি হিসেবে বিশ্বমানের হলেও সমষ্টিগতভাবে আমরা বিশ্বমানে পৌঁছতে পারিনি। এ অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে আমাদের দক্ষ সংগঠক সৃষ্টি করতে হবে এবং সংগঠনগুলোকে বিকশিত করতে হবে।

একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হলে এর সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী হতে হবে। বাঙালি জাতি শুরু থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পরাধীন ছিল, কারণ- হয় এর দরকারি সংগঠনগুলো শক্তিশালী ছিল না অথবা বিদেশি শাসকগোষ্ঠী সংগঠনগুলোকে বিকশিত হতে দেয়নি। বর্তমানে অর্থের প্রভাবে স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের যথাযথ বিকাশ ঘটছে না। তবে দেশের আর্থিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মূল্যবোধের অভাব রয়েছে।

আমরা মুখে মুখে বলছি ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। কিন্তু কাজের সময় দেখতে পাচ্ছি রাষ্ট্রের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। একা বাঙালি দেবতা, কিন্তু একসঙ্গে হলে তারা অমানুষ। বুদ্ধি আমাদের কারো চেয়ে কম নয়, কিন্তু স্বাস্থ্যে, কর্মিষ্ঠতায়, উদ্যোগে, উদ্যমে আমরা তাদের চাইতে অনেক নিচে। কর্মোদ্যোগের অভাবে আমাদের সব উদ্যম, সপারগতা, বুদ্ধিমত্তা সামাজিক স্বার্থরক্ষার বদলে ব্যবহৃত হতে থাকে ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষার ছোট্ট কুঠুরিটুকুর জন্য।

ব্যক্তিগত স্বার্থ হাতিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আমাদের বুদ্ধি যে পরিমাণ টনটনে, সামাজিক স্বার্থের বেলায় তা ঠিক সে পরিমাণেই ভোঁতা। আত্মঘাতী ও নেতিবাচক মানুষটি অন্যের যাবতীয় সাফল্যকে মিথ্যা প্রমাণ করে নিজেকে পৃথিবীব্যাপী ব্যর্থতার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। যে মানুষ কোনো কাজ করে না, যার কোনো সাফল্য নেই, গৌরব নেই, পরনিন্দা না করে নিজের অস্তিত্বকে অন্যের কাছে সপ্রমাণ বা অনুভব করার আর কী উপায় তার?’

(ভিনদেশে) দশজন মানুষ যদি একটা সংগঠন তৈরি করে তখন সেখানে থাকে চারটি দল। প্রথম দলে থাকে তিনজন। এরা সুইসাইডার; সংশপ্তক। সংগঠনের আদর্শের জন্য এরা জন্মান্ধের মতো প্রাণ দেয়। পরের দলে থাকে আরও তিনজন। প্রথম তিনজনকে প্রাণ দিতে দেখলে এরাও প্রাণ দিয়ে বসে। যদিও এর পরের দলে থাকে দুজন। এরা মাঝারি ক্ষমতার মানুষ; দ্বিধাগ্রস্ত।

সবাই সামনের দিকে যাচ্ছে দেখলে তারাও সামনে যাবার কথা ভাবে। শেষ দলে থাকে দুজন। এরা সমালোচক, ক্রিটিক। এরা কিছু করে না, শুধু বসে বসে লেজ নাড়ে আর কথা কয়: ‘ভালো হতো আরও ভালো হলে’। কিন্তু আমাদের দেশে দলের সংখ্যা থাকে পাঁচটি। এই পঞ্চমটিই আমাদের সংগঠনের মূল আততায়ী। আমাদের জাতিগত অক্ষমতা, অসহায়তা, হীনমন্যতা এবং অমানবিক জীবন-পরিস্থিতির ভেতর থেকে জন্ম নিয়ে, জাতির প্রতিটা উদ্যমকে পেছন থেকে ছুরি মেরে মাটিতে শুইয়ে দেবার জন্যে এরা সবার আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে।’

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর বিভিন্ন বক্তব্য  ও লেখা থেকে

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *