অর্থবহ ক্যারিয়ার খুঁজে পাওয়ার উপায় ইকিগাই

মো. বাকীবিল্লাহ : ইকিগাই (Ikigai) হলো একটি প্রাচীন জাপানি দর্শন, যা জাপানিদের জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন- ইকিগাই জাপানিদের সুখ এবং দীর্ঘায়ুর কারণ। পশ্চিমা সংস্কৃতিও এটিকে একটি অর্থবহ ক্যারিয়ার খুঁজে পাওয়ার উপায় হিসাবে বেছে নিয়েছে।

এই নিবন্ধে, আমরা ইকিগাই -এর উত্স ব্যাখ্যা করব। জানাবো- ইকিগাই -এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য। কীভাবে আপনার ইকিগাই খুঁজে বের করতে হবে ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি খুঁজে বের করার সময় কী লক্ষ্য রাখতে হবে তাও আমরা আলোচনা করব।

ইকিগাই মানে কী?

ইকিগাই হলো একটি জাপানি ধারণা। যার অর্থ হলো- আপনার ‘reason for being.’ বা ‘হওয়ার কারণ।’ জাপানি ভাষায় ‘ইকি’ মানে ‘জীবন’, এবং ‘গাই’ মানে মূল্য। আপনার ইকিগাই হচ্ছে- আপনার জীবনের উদ্দেশ্য বা আপনার আনন্দ। এটিই আপনাকে আনন্দ দেয় এবং আপনাকে প্রতিদিন কাজে বেরিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে।

এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঐতিহ্যগত এই জাপানি দর্শন আপনার আনন্দ খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে পশ্চিমা ব্যাখ্যাটি আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার খোঁজার একটি পদ্ধতি হিসাবে ইকিগাইকে ব্যবহার করেছে।

ইকিগাই-এর পশ্চিমা ব্যাখ্যা বলে যে, আপনি আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ার খুঁজে পেয়েছেন- তখনই বলা যাবে, যখন আপনার কর্মজীবনে চারটি গুণের সন্নিবেশ ঘটবে। গুণ চারটি হচ্ছে-

১. আপনি কাজটিতে ভালো বা দক্ষ

২. আপনি কাজটিকে ভালোবাসেন

৩. কাজটি বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজনীয়

৪. কাজটির অর্থমূল্য আছে

অর্থাৎ আপনার পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উপরোক্ত চারটি বিষয় খেয়াল রাখলে আপনার ক্যারিয়ার হতে পারে অর্থবহ ও আনন্দময়।

ক্যারিয়ার বাছাইয়ে ইকিগাই পদ্ধতি

এবার আসুন ক্যারিয়ার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ইকিগাই পদ্ধতি কীভাবে প্রয়োগ করবেন সেটি সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

ক্যারিয়ার বাছাইয়ের কথা যখন বলা হয়, তখন এটি জীবনের কোন পর্যায়ে এসে বাছাই করা হচ্ছে সেটি বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আপনি কর্মজীবনে প্রবেশের আগে নাকি শিক্ষা জীবনের প্রথম পর্যায়ে এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করবেন?

আপনি যদি কর্মজীবনে প্রবেশের আগে এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে চান, তাহলে নিচের নিয়মটি অনুসরণ করতে পারেন।

প্রথমে দেখুন, আপনি কোন কোন কাজে মোটামুটি দক্ষ? সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে ফেলুন।

দ্বিতীয় ধাপে দেখুন, আপনার তালিকার কাজগুলোর মধ্যে কোন কাজগুলো আপনার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে? সেগুলো রেখে বাকিগুলো তালিকা থেকে বাদ দিন।

তৃতীয় ধাপে দেখুন আপনার বেশি ভালোলাগার কাজগুলো পৃথিবীবাসীর প্রয়োজন আছে কি? যেগুলো পৃথিবীর মানুষের তেমন একটা প্রয়োজন নেই, সেগুলোকে তালিকা থেকে বাদ দিন।

চতুর্থ ধাপে- লক্ষ্য করুন, বর্তমান তালিকার কাজগুলোর কতটুকু অর্থমূল্য আছে। এগুলো করলে আপনি কি পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবন-ধারণ করার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন? এবার অর্থমূল্য আছে এমন কাজগুলোর তালিকা করুন। বাকিগুলো বাদ দিন। এবার তালিকা থেকে সবচেয়ে বেশি পছন্দের কাজটিকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিন।

এভাবে ক্যারিয়ার বা পেশা বাছাই করলে জীবনে সুখী হওয়া অনেকটাই সহজ হবে।

ইকিগাই কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আয়ুষ্কালের ক্ষেত্রে জাপান বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। সেখানে মহিলাদের গড় আয়ু ৮৮.০৯ বছর, পুরুষদের ৮১.৯১। যদিও এক্ষেত্রে ডায়েট একটি মূখ্য ভূমিকা পালন করে, তবে অনেক জাপানি বিশ্বাস করেন যে, ইকিগাই তাদের দীর্ঘায়ু এবং সুখী জীবনযাপনে বড় ভূমিকা রাখে।

একটি দীর্ঘ এবং সুখী জীবন যাপন করা ছাড়াও ইকিগাই আপনাকে নিম্নোক্তভাবে সাহায্য করতে পারে:

ক. আপনার সঠিক কাজের লাইফস্টাইল ডিজাইন

খ. কর্মক্ষেত্রে শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ তৈরিতে

গ. কর্ম ও জীবনের ভারসাম্য তৈরিতে

ঘ. আপনার কাঙ্খিত ক্যারিয়ার অর্জনে

ঙ. আপনার কাজকে উপভোগ করতে

আপনি যখন আপনার ইকিগাই জানবেন ও এর অর্থ বুঝতে পারবেন, তখন বিশ্ব আপনার কাছে যে কাজটি প্রত্যাশা করে এবং আপনি যে কাজটি করতে চান- তার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য তৈরি হবে।

ইকিগাই আবিষ্কারের ৩টি ধাপ

আপনার ইকিগাই আবিষ্কার করতে সাহায্য করার জন্য এখানে শীর্ষ তিনটি আলোচনা করা হলো।

ধাপ-১ : আপনার ইকিগাই খুঁজে পেতে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন

ক. আপনি কী ভালোবাসেন?

আপনি যদি বর্তমানে কাজ করেন:

আপনি কি আপনার কাজে নিমগ্ন?

আপনি কি প্রতিদিন কাজে যেতে ভালোবাসেন, নাকি দ্রুত অফিস ছাড়তে পছন্দ করেন?

আপনার কাজের ক্ষেত্রে কি আবেগ বা টান অনুভব করেন?

 

আপনার যদি শখ বা নৈপুণ্য থাকে:

আপনার কি একটি শখ বা নৈপুণ্য আছে যা আপনি প্রায়ই করে থাকেন?

আপনি কি অন্য কিছুর চেয়ে আপনার শখ বা নৈপুণ্যকে বেশি প্রাধান্য দেন?

আপনি কি আপনার শখ বা নৈপুণ্যের সাথে আবেগগতভাবে যুক্ত?

 

খ. আপনি কিসে ভালো?

আপনি যদি বর্তমানে কাজ করেন:

লোকেরা কি আপনার কাজের সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে আপনার কাছে পরামর্শ নেয়?

আপনি কি সংশ্লিষ্ট কাজে সেরাদের একজন?

আপনি যা করেন তাতে কি বিশেষজ্ঞ হতে চান?

 

আপনার যদি শখ বা নৈপুণ্য থাকে:

লোকেরা কি আপনার শখ বা নৈপুণ্যের জন্য আপনাকে প্রশংসা করে?

আপনি কি আপনার শখ বা নৈপুণ্যের ক্ষেত্রে সেরাদের একজন?

আপনি কি আপনার শখ বা নৈপুণ্যে বিশেষজ্ঞ হতে চান?

 

গ. বিশ্ববাসীর কতটুকু প্রয়োজন?

আপনি যদি বর্তমানে কাজ করেন:

আপনার কাজটিকে বাজারে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়?

আগামী বছর, ১০ বছর ও ১০০ বছর পরের কথা চিন্তা করুন — আপনার কাজ কি তখনও মূল্যবান হবে?

আপনি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, বা পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করছেন?

 

আপনার যদি শখ বা নৈপুণ্য থাকে:

আপনার শখ বা নৈপুণ্যের কি বাজারে চাহিদা বেশি?

আপনার শখ বা নৈপুণ্য কি ভবিষ্যতে মূল্যবান হবে?

আপনার শখ বা নৈপুণ্য কি সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত সমস্যার সমাধান করছে?

 

ঘ. আপনার কাজের জন্য কি মানুষ অর্থ প্রদান করবে?

আপনি যদি বর্তমানে কাজ করেন:

আপনি যে কাজ করছেন তার জন্য কি অন্য মানুষদের বেতন দেওয়া হচ্ছে?

আপনি কি একটি ভালো জীবিকা নির্বাহ করেন/আপনি কি শেষ পর্যন্ত আপনার কাজ করে একটি ভালো জীবনযাপন করতে পারবেন?

আপনার কাজের ক্ষেত্রে কি ভালো না অসুস্থ প্রতিযোগিতা আছে?

 

আপনার যদি শখ বা কারুকাজ থাকে:

অন্য লোকেরা কি একই শখ বা নৈপুণ্য থেকে ক্যারিয়ার তৈরি করেছে?

আপনার চারপাশের লোকেরা কি আপনি যা করেন বা তৈরি করেন তা কখনো কিনতে চেয়েছেন?

আপনি যা করেন বা তৈরি করেন তার জন্য কি ভালো না অসুস্থ প্রতিযোগিতা আছে?

আপনি যদি ‘যদি আপনি বর্তমানে কাজ করছেন’ বিভাগে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি যা করছেন তা করতে থাকুন!

আপনি যদি ‘যদি আপনার শখ বা নৈপুণ্য থাকে’বিভাগে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ দেন — অভিনন্দন! আপনি আপনার শখকে আপনার স্বপ্নের ক্যারিয়ারে পরিণত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন। শুরু করতে ২য় ধাপে যান।

আপনার উত্তর না হলে কী হবে?

চিন্তা করবেন না; আপনার ইকিগাই খোঁজার বিষয়ে আরও টিপসের জন্য পড়তে থাকুন।

 

ধাপ-২ : আপনার ইকিগাই খুঁজে পেতে ব্রেইন স্টোর্মিং

আপনি সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন এমন একটি কর্মমুখর দিনের কথা কল্পনা করুন। দিনটিতে আপনি কী কী কাজ করেছেন, কার সাথে কথা বলেছেন, আপনি কী পরেছেন, কী ভালো লেগেছে, কী মন্দ লেগেছে ইত্যাদি।

বিশ্বাস করুন, এই ভিজুয়ালাইজেশন আপনার ইকিগাই বা প্রকৃত আপনাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

আপনি যখন ভিজ্যুয়ালাইজ করা শেষ করবেন, তখন এটি লিখতে ভুলবেন না। আপনি যেমন ভিজ্যুয়ালাইজ করছেন সেভাবেই লিখুন।

এবার বিষয়গুলো নিয়ে একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে ভাবুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন। আবার ইকিগাই পদ্ধতির চারটি প্রশ্নের আলোকে যাচাই করুন।

আশা করা যায় আপনি একটি সুন্দর সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই সময়ে বিভিন্ন সন্দেহ, ভয় বা নেতিবাচক চিন্তাভাবনা আসা স্বাভাবিক। আপনার ভবিষ্যতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া একটি ভারী চ্যালেঞ্জের মতো মনে হতে পারে। মনে রাখবেন, আপনি যা ভাবতে পারেন তার চেয়েও আপনি অনেক শক্তিশালী।

 

ধাপ-৩ : আপনার ইকিগাই খুঁজতে অধ্যয়ন করুন

আপনার কর্মমুখর একটি দিন কেমন- তা নিয়ে আপনার মাথায় এখন একটি চিত্র আছে। এখন, অধ্যয়ন, গবেষণা, ক্লাসে অংশ নেয়া বা একজন কোচ বা পরামর্শদাতার স্মরণাপন্ন হোন। এই পদক্ষেপটি আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

উদাহরণস্বরূপ-

ধরুন, আপনি যদি বিয়ের ফটোগ্রাফার হতে চান। তাহলে একজন পেশাদার বিয়ের ফটোগ্রাফারের পরামর্শ নিন। তার পরামর্শ দেওয়ার পরে, আপনি বুঝতে পারবেন বিষয়টি আপনার উপযুক্ত কি-না।

অথবা, আপনি হয়তো ডিজিটাল মার্কেটার হতে চান। কিন্তু একজন পেশাদার মার্কেটারের সাথে আলাপ করে আপনার মনে হতে পারে এর প্রসেসগুলো আপনার সাথে যাবে না।

আপনি যদি এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান এবং দেখেন যে, আপনার চিন্তা বাস্তব জীবনের প্রত্যাশা পূরণ করে — অভিনন্দন, মনে হচ্ছে আপনি আপনার ইকিগাই খুঁজে পেয়েছেন। এটিকে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা লেখাটি শেষ পর্যন্ত করুন।

আর যদি বিপরীতটি সত্য হয় তবে চিন্তা করবেন না, আপনার ইকিগাই খুঁজে পেতে একটু সময় লাগতে পারে।

আপনি আপনার ইকিগাই খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত একটি ভিন্ন কাজ, শখ বা নৈপুণ্যের সাথে এক থেকে তিন ধাপের পুনরাবৃত্তি করুন। আপনি যদি এখনও এটি খুঁজে না পান তবে বিভিন্ন ভূমিকা এবং/অথবা কারুশিল্পের সাথে ড্যাবলিং এবং পরীক্ষা করার কথা বিবেচনা করুন।

কেক বেক করুন, কীভাবে কোড করতে হয় তা শিখুন, স্বেচ্ছাসেবক করুন, একটি বুক ক্লাব শুরু করুন, একটি লোগো ডিজাইন করুন — এটা কোন ব্যাপার না। আপনার সাথে যা কথা বলে তা না পাওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা চালিয়ে যান।

 

দ্রষ্টব্য: আপনার ইকিগাই খোঁজার অর্থ এই নয় যে আপনি আপনার কর্মজীবনের প্রতিটি দিক পছন্দ করবেন। এর মানে হল যে আপনি এমনকি অ-নিখুঁত অংশগুলিও গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। এর কারণ হল আপনার কর্মজীবন আপনি যা ভালোবাসেন, আপনি কিসের জন্য অর্থপ্রদান করেন এবং বিশ্বের যা প্রয়োজন তার সাথে সারিবদ্ধ।

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.