সৌন্দর্য-বিশুদ্ধতায় অনন্য ওমান

আনিসুর রহমান এরশাদ

সালতানাত অব ওমান। রহস্যময় আরবের লুকানো মুক্তা। তেলসম্পদে সমৃদ্ধ মরুভূমির দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশী বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশের অধিকারী। যেখানে সুউচ্চ পর্বতমালার পাশেই উজ্জ্বল শুভ্র বালুর সমুদ্র সৈকত। সফল সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রয়েছে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি, প্রাচীন বাজার, চমৎকার দুর্গ, প্রাচীন বসতি ও আকর্ষণীয় স্তম্ভসহ পর্যটন স্থানসমূহ।

দর্শনার্থীরা ভ্রমণ, পাহাড়ে আরোহন, কচ্ছপ-ডলফিন ও পাখি দর্শন এবং মরুভূমিতে সাফারিসহ বিভিন্ন আনন্দদায়ক কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারেন। ইউনেস্কো ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সালাহ নগরী এবং বহু প্রাচীন নিদর্শন সমৃদ্ধ স্থানকে বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। আজ জানাব আরব উপদ্বীপের ধনী সুলতানেট ওমান সম্পর্কে।

এক নজরে

সরকারি নাম : সালতানাত ওমান
রাজধানী ও বৃহত্তম শহর : মাসকাত
দাপ্তরিক ভাষা : আরবি
ধর্ম : ইসলাম

জাতীয়তা : ওমানি
গরকার পদ্ধতি : ইউনিটারি পার্লামেন্টারি অ্যাবসেলিউট মনার্কি
সুলতান : হাইসাম বিন তারিক আল সাইদ (রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারের প্রধান)
আইনসভা : কাউন্সিল অব ওমান

উচ্চকক্ষ : কাউন্সিল অব স্টেট (মজলিশ আল-দাওলা)
নিম্নকক্ষ : কনসালটেটিভ অ্যাসেমব্লি (মজলিশ আল শুরা)
আয়তন : তিন লাখ ৯ হাজার ৫০১ বর্গকিমি

জনসংখ্যা : ৫২ লাখ ১৪ হাজার ৮২৯ জন
মুদ্র : ওমানিয়া রিয়াল
জাতিসংঘে যোগদান : ৭ অক্টোবর ১৯৭১
গড় আয়ু: ৭৬বছর

সিন্দাবাদের স্মৃতিধন্য

গালফ আর আরব সাগর বিধৌত চমকে দেওয়ার মতো এক আরব উপদ্বীপ ওমান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী মাজেন বিন গাদুবা (রা.) এর স্মৃতি ধন্য ওমান। আরব্য রজনীর দিগ্বিজয়ী নাবিক সিন্দাবাদের স্মৃতিধন্য ওমান।

সাদা বালুকাবেলা

সুউচ্চ পাথুরে পাহাড়, সাগরের অথৈ নীল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালুকাময় মরুপ্রান্তর, সাদা বালুকাবেলা, বিশাল আকাশের নীলিমা আর প্রাসাদের দেশ ওমান। আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দেশ। স্থলভাগে উত্তর-পশ্চিমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, পশ্চিমে সৌদি আরব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়েমেন।

সমুদ্রসীমা

ইরান ও পাকিস্তানের সঙ্গে সমুদ্রসীমা রয়েছে দেশটির। দক্ষিণ-পূর্বে আরব সাগর, উত্তর-পূর্বে ওমান উপসাগর। পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত দেশটি ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক দৃশ্য

বেশির ভাগ লোকালয় সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত। ওমান উপসাগর, আরব সাগর, এবং আর রাব আল খালি মরুভূমি ওমানকে বাকি সব দেশ থেকে পৃথক করেছে। ওমানের পর্বতগুলো প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিক থেকে অনন্য এবং সেখানে গাড়ি চালানো বিশেষ আনন্দের।

সমুদ্রপথ

তিনটি মহাদেশই সমুদ্রপথ ব্যবহারের জন্য আরব উপদ্বীপ সালতানাত অব ওমানকে প্রয়োজন। আরব উপদ্বীপ ওমান ২ হাজার বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। পার্সিয়ান, পর্তুগিজ বা আব্বাসীয় খেলাফত- সব শাসনামলের স্বাক্ষর আজও বহন করে চলেছে ওমানের বিভিন্ন গ্রাম এবং শহরে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ওমান শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল।

ইতিহাস

পর্তুগাল ও ব্রিটেনের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চলত। উনবিংশ শতাব্দীতে তাদের প্রভাব পাকিস্তান ও ইরান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দেশটি একসময় ছিল প্রাচীন সিল্করুটের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রভাব কমতে শুরু করে।

রাজা

সালতানাতের ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছায়া দেখা দেয়। ওমানের রাজা সুলতান উপাধি ব্যবহার করেন। সুলতান একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারের প্রধান। ওমানের সুলতানেরা বংশানুক্রমে ক্ষমতায় আসেন। আধুনিক ওমানের রূপকার সুলতান কাবুস বিন সাঈদ।

ভূপ্রকৃতি

ওমানের শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি এলাকা মরুভূমি, ১৫% পর্বত এবং মাত্র ৩% উপকূলীয় সমভূমি। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমের পাহাড়ে সবুজের হাতছানি, জুন জুলাইতে যখন থাকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা, তখন দেশের পূর্ব-উত্তরাঞ্চলে লু হাওয়া বইতে থাকে। শতকরা ৫০ ভাগ লোক রাজধানী মাস্কাট ও বাটিনাহ শহরে বাস করে।

পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য

ওমানে বহু বিদেশীর বাস। বিশ্ব শান্তি সূচকেও দেশটির ভালো অবস্থান রয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশ এখানে দূষণমুক্ত আর বিশুদ্ধ। দূষণহীন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে হেঁটে বেড়ানো যায় এর শান্ত শহরগুলোতে। ওমান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বেশ সমৃদ্ধ। অবিমিশ্র প্রকৃতির স্নিগ্ধ ছোঁয়া বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে বেশ উপভোগ্য ।

ভাষা

ওমানের আরবি ভাষীদের মধ্যে দ্বিভাষিকতা বিদ্যমান। আনুষ্ঠানিক ও সরকারি কর্মকাণ্ডে কথ্য ও লিখিত ভাষা হিসেবে আদর্শ আরবি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তায় ভাবের আদান-প্রদানে স্থানীয় আরবি উপভাষাগুলিই বেশি ব্যবহৃত হয়।

হর্মুজ প্রণালীর উপর অবস্থিত পর্বতময় মুসান্দাম উপদ্বীপে শিহু গোত্রের লোকেরা শিহ্হি নামের একটি ইরানীয় ভাষায় কথা বলে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত ওমানিদের মধ্যে অনেকে বালুচি ভাষায় কথা বলেন। বিদেশী কর্মীরা বাংলা, হিন্দি, উর্দু, ও ফার্সি ভাষায় কথা বলেন। ইংরেজিও ব্যাপক প্রচলিত।

অর্থনীতি

ওমানের অর্থনীতির বড় অংশ আসে তেল ও পর্যটন থেকে। মাছ, খেজুর ও কিছু কৃষি পণ্যও রপ্তানি করে। গ্যাসের মজুদ রয়েছে। দেশের শতকরা ১ ভাগেরও কম জায়গা কৃষিকাজের উপযোগী। এর বেশিরভাগই খেজুরবাগান। ওমানে ২০০ জাতের খেজুর উৎপন্ন হয়। চাষিদের ৬০ ভাগ জমি খেজুর উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। টমেটো, তরমুজ, ডালিম, লেবু, আম, গম, আলু, পেঁয়াজ এবং কলার চাষ হয়।

ওমানের জমিতে জুনিপার, জলপাই গাছ, খেজুর, জুঁই, কাঁটা ঝোপ, ডুমুর, দেবদারু এবং খোলার গাছসহ সমৃদ্ধ উদ্ভিদ রয়েছে। গ্রিনহাউস তৈরি করে ভেতরকার নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ায় শাকসবজি ফলানো হচ্ছে। অনেকে মাছ ধরে এবং পশুপালন করে। দেশটিতে জনবসতি হওয়ার মতো জায়গা মোট স্থলভাগের মাত্র ৩ শতাংশ। জনসংখ্যার একটি অংশ যাযাবর। তেল ও গ্যাস আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত লোকদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ আর মাছধরা।

ধর্ম

দেশটির প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ মুসলমান। ছেলেরা সাধারণত নিজেদের কাধ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত দীর্ঘ হাতা দিয়ে এক প্রকার জামা সাদা ডিশডশা বা জোব্বা পরে। মেয়েরা মাথা থেকে পা এর গোড়ালি পর্যন্ত সকল অঙ্গ ঢাকা কালো কাপড়ের আবাইয়া বা পোশাকের সঙ্গে বোরকা-হিজাব পরে।

সংস্কৃতি

ওমানের লোকেরা খুব অতিথিপরায়ণ। অতিথিকে খেজুর, এলাচ দিয়ে তৈরি কফি (কাহওয়া) এবং অন্যান্য ফল দিয়ে আপ্যায়ন করে। নানারকম ঝাল মাংস ওমানের লোকদের প্রিয়। তাদের প্রতিদিনের খাবার তালিকায় মুরগি, মাছ আর খাসির মাংস থাকবেই। বিশেষ পছন্দের পানীয় হচ্ছে এলাচের গন্ধওয়ালা লবণাক্ত ঘোল লাবান। ঈদের সময় নানারকমের হালুয়া রান্না করে।

আকর্ষণ

অন্যতম প্রধান আকর্ষণ উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত রুক্ষ আল হাজর পর্বতমালা। ৩০১০ মিটার উঁচু জেবেল শামস এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। সোহার ও মাস্কটের মধ্যবর্তী স্থানে ওমান উপসাগরের উপকূল ধরে রয়েছে বিস্তৃত সৈকত, যেগুলিতে ডাইভিং, পানির নিচে ডুব দেওয়া, এবং ডলফিন ও কচ্ছপদের সাথে খেলার ব্যবস্থা আছে।

পাখি

পক্ষীপ্রিয়দের জন্যও ওমান জনপ্রিয়। স্থানীয় প্রায় ৮০ প্রজাতির এবং অতিথি প্রায় আরও ৪০০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অতিথি পাখিরা নির্দিষ্ট ঋতুতে ওমানে ফিরে ফিরে আসে।

পরিচ্ছন্ন শহর

মরুভূমির বিশালাকার বালিয়াড়িগুলি ঘুরে দেখতেও অনেকে পছন্দ করেন। ওমানের চুনাপাথরের পাহাড়ী গুহাগুলিও বিখ্যাত। ওমানের বড় শহরগুলো খুবই শান্ত এবং খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন । ওমানের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৮৬সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কাসর আল আলম

ঐতিহাসিকভাবেই দেশটির রাজধানী পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য বন্দর। মাসকাটের কাসর আল আলম স্ট্রিটে রয়েছে পর্তুগিজদের তৈরি দু’টি দুর্গ- আল জালালি দুর্গ এবং আল মিরানি দুর্গ। এই দুর্গ দু’টির মাঝখানে অবস্থিত ‘কাসর আল আলম’ রাজপ্রাসাদ। নীল আর সোনালি স্তম্ভের অনিন্দ্যসুন্দর এই প্রাসাদটি ওমান সালাতানাতের সুলতানের অফিস।

সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ

শহরটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মসজিদ। অনেক দূর থেকে দেখা যায় এই মসজিদটি। যা সুলতান কাবুসের শাসনামলের ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত হয়। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির বড় বিশেষত্ব মেঝেতে বিছানো পার্সিয়ান কার্পেট। এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্পেট।

মসজিদটির রয়েছে পঞ্চাশ মিটার উঁচু সুদৃশ্য গম্বুজ এবং ইসলামের পাঁচটি খুঁটির প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচটি মিনার। সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি এই মসজিদের ভেতরের চত্বরে রয়েছে মনোরম বাগান।

দেয়ালে খোদিত কুরআনের আয়াত এর অভ্যন্তরীণ সজ্জাকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। সবমিলিয়ে এর খিলান, সজ্জিত দেয়াল, অনন্য কাচের অঙ্কন, লণ্ঠন, গম্বুজ, ঝাড়বাতি এবং অভ্যন্তর নকশার মধ্যে মসজিদটি একটি নিখুঁত স্থাপত্য সৌন্দর্য।

আল আমিন মসজিদের সুউচ্চ মিনারগুলোও রাতে আলোর রশ্মি ছড়ায়ে চমৎকার দৃশ্যের জন্ম দেয়।

মাসকাট শহর

মাসকাট শহরটি প্রাচীন ইতিহাস এবং সমৃদ্ধ ইসলামী ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে চলেছে এর অসাধারণ সব দুর্গ, রাজপ্রাসাদ আর মসজিদের মাধ্যমে।

সাগর আর পাহাড়ের মাঝখানের মাসকাটে পর্তুগিজ রীতিতে নির্মিত অনেক ভবনের দেখা মেলে। তবে স্থাপত্যগুলোতে আরব, পার্সিয়ান, ইথিওপিয়ান, ভারতীয় এমনকি আধুনিক পাশ্চাত্য ধাঁচও চোখে পড়ে। মাসকাট শহরটি মূলত ছোট ছোট তিনটি অংশের সমষ্টি।

প্রাচীরঘেরা পুরনো শহরটিতে রয়েছে রাজপ্রাসাদসমূহ। শহরের দ্বিতীয় অংশটির নাম মাতরাহ। অন্য শহরটির নাম রুউয়ি। এই অংশটি মাসকাট শহরের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক কেন্দ্র। মাসকাট থেকে শহরের প্রধান হাইওয়ে সুলতান কাবুস হাইওয়ে ধরে গেলে পথে পড়ে কুরুম জেলা, মাদিনা আল সুলতান কাবুস, আল খুয়াইর, সিব প্রভৃতি স্থান।

জাবাল আল-আখদার

সবুজ পর্বত জাবাল আল-আখদারে রয়েছে বেশকিছু বন্যপ্রাণির আবাস। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অটুট রাখতে এবং বন্যপ্রাণিদের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে এই অঞ্চলকে ‘ন্যাচারাল রিজার্ভ’ ঘোষণা করেছে। হাইকিং বেশ জনপ্রিয়।

জাবাল আখদারের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে অনিন্দ্যসুন্দর সব মরূদ্যান। এই মরূদ্যান এবং পাহাড়ি চত্বরগুলোতে ঘুরে বেড়ানো বেশ রোমাঞ্চকর। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় জাবাল আখদার ধরা পড়ে এক মোহনীয় রূপে, অপার্থিব সেই সৌন্দর্য!

সাইক মালভূমি

উর্বর সাইক মালভূমিতে ডালিম, এপ্রিকট, পিচ বা আঙুরের মতো ফল জন্মে এখানে। এছাড়া এখানে জন্মে গোলাপি রঙের সুগন্ধি দামাস্কাস গোলাপ। এই গোলাপ থেকে তৈরি হয় এই অঞ্চলের বিখ্যাত পণ্য গোলাপজল।

নিজওয়া ফোর্ট

ওমানের ঐতিহাসিক নিজওয়া শহরে অবস্থিত বিশাল একটি দুর্গ নিজওয়া ফোর্ট। প্রাচীন এই স্থাপত্যটি ওমানের সবচেয়ে বেশি পরিদর্শিত স্থাপনা। এই কেল্লার প্রধান আকর্ষণ এর ত্রিশ মিটার উঁচু বিশাল চার-কোণাকৃতির টাওয়ার। টাওয়ারে ওঠার জন্য রয়েছে প্যাঁচানো সিঁড়িপথ। টাওয়ারের ছাদে চারদিকে তাক করা রয়েছে চারটি কামান। দুর্গটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে।

রাস আল জিনয

মায়াবী সৌন্দর্যে অনন্য রাস আল জিনয এলাকাটি বিপন্নপ্রায় সবুজ কচ্ছপ রিজার্ভের জন্য বিখ্যাত। বাদামি বালুর সৈকতের এই রিজার্ভে রয়েছে প্রায় বিশ হাজার মা কচ্ছপ যারা নিয়মিত ডিম দেয় এবং ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করে। এখানে দর্শকদের জন্য রয়েছে কচ্ছপের পূর্ণ জীবনচক্র কাছ থেকে দেখার দুর্লভ সুযোগ।

সালালাহ

সালালাহ রুক্ষ জমিনে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। ওমানের দোফার প্রদেশের রাজধানী এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এটি বিখ্যাত এর সমুদ্রসৈকত, কলাবাগান এবং এর সবুজের উৎস বর্ষাকালের জন্য। বর্ষার অবারিত বৃষ্টিপাত এখানকার অনুর্বর মরুভূমিকে ঘন সবুজে আচ্ছাদিত করে তোলে।

ফলে চারিদিকে চোখে পড়ে সবুজের চিরায়ত সৌন্দর্যে সজ্জিত মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। বর্ষার পানি পেয়ে এখানকার জলপ্রপাতগুলো যেন প্রাণ ফিরে পায় । এককালে সালালাহ ছিল সুগন্ধি ধুনোর কল্যাণে সিল্করুটের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। একসময় সালালাহ ওমানের রাজধানী ছিল।

রুবা আল খালি

বিশ্বের বৃহত্তম বালুকামায় প্রান্তর রুবা আল খালি। আরবের মরুভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত একটি মরুভূমি। ওমানের অংশের রুব আল খালি পড়েছে দোফার প্রদেশে। অভিযাত্রীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় গন্তব্য সোনালি বালিয়াড়ির এই মরুভূমি।

মাসিরাহ আইল্যান্ড

ওমানের পূর্ব উপকূলে আরব সাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি দ্বীপ মাসিরাহ আইল্যান্ড। এটি দেশটির সর্ববৃহৎ দ্বীপ। এখানে রয়েছে রয়্যাল এয়ার ফোর্স অব ওমানের একটি এয়ার বেস এবং কয়েকটি ছোট শহর। দ্বীপটির এক প্রান্তে রয়েছে পাহাড়। আরেক প্রান্তে আছে শুভ্র বালির সৈকত। প্রচুর বাতাসের কারণে এই সৈকতগুলো উইন্ড এবং কাইট সার্ফিংয়ের জন্য আদর্শ জায়গা।

আল জিন

জাজিরাতুল আরবের এই মরু জনপদের রূপ বৈচিত্র্য অবাক করে দেয়। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গুহা মাজলিস আল জিন এখানে অবস্থিত।

দর্শনীয় স্থান

গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে কুরুম ন্যাশনাল পাক, বাইত আয- যুবাইর জাদুঘর, মাতরাহর কর্নিশ, আল কুরুম সৈকতে বা আল বুস্তান সৈকত, বান্দর আল খায়রান বা আল-হিরান, ডুকম সৈকত, ধোফার সৈকত, আইসোলে আল হিলানায়াত, বান্দর খায়রান রিজার্ভ, অপেরা হাউস, আল খোর মসজিদ, সামরিক যাদুঘর, বাইত গড়াইজা, রামলত আল ওয়াহিবা মরুভূমি, আল মুগসাইল সমুদ্র সৈকত, সুমুহরাম পুরাতন শহর, সালানায় মার্নিফ গুহা, ওয়াদি গুল।

আরবের নরওয়ে

বাহলার পুরান দুর্গ, ওয়াদি শুওয়ামিয়াহ, উবারের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, জাবরিনের দুর্গ। মুসান্দাম উপদ্বীপের বহু ফিজার্ডকে আরবের নরওয়েও বলা হয়। পর্যটকদের জন্য অন্যরকম আকর্ষণ ওয়াদি। পাহাড়ের মাঝখানের শুকনো উপত্যকাগুলোর নাম ওয়াদি। এগুলো বর্ষা মৌসুমে পানিতে ভরে উঠে নদীর রূপ নেয়।

পাল তোলা নৌকা

সমুদ্রগামী দেশ হওয়ায় ওমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হলো ধাও (পাল তোলা নৌকা)। এই নৌবহরগুলো শত শত বছর ধরে আরব উপদ্বীপ, ভারত এবং পূর্ব আফ্রিকা বরাবর ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ধাওগুলো বাণিজ্য, পর্যটন এবং মাছ ধরার লক্ষ্যে কাজ করে এবং ওমানের উপকূলরেখার পাশেই এগুলি দেখা যায়।

খাদ্য

ওমানের মরুভূমির আদিবাসিদের প্রধান খাদ্য খেজুর ও উটের দুধ। অন্যদিকে সমুদ্র উপকূলবাসীর এসব খাবারের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ ও বিভিন্ন শাকসবজি। মরুবাসীরা বর্তমানে ওমানে ‘বেদু’ নামে পরিচিত। অনেকে এদের ‘জেবালি’ নামেও ডাকে। বর্তমানে জেবালিদের প্রধান জীবিকা উট-ছাগল-ভেড়া ও মেষ পালন।

জেবালি

ওমানে আরবীর পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা হচ্ছে জেবালি। পোশাকে আশাকে এরা বেশ রক্ষণশীল। জেবালি নারীরা বোরকার সাথে মুখোশ পরে। যাতে থাকে ঠোঁটের উপরে গোঁফের মত প্লাস্টিকের কাজ আর চোখের উপর আলাদিনের জ্বীনের মত ইয়া মোটা প্লাস্টিকের কাজ। পুরুষরা যাতে আকর্ষিত না হয়- সে জন্যই করা। জেবালি মেয়েরা স্বামীর খুব যত্ন করেন।

জীবন-জীবিকা

একদা মৎস্যজীবী আর মরুচারী বেদুঈন জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই জনপদের মানুষের জীবনে আজ লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তবে শত আধুনিকতার চাপেও তারা ভুলে যায়নি তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক কেন্দুরা বা ডিসডাসাকে। আতিথেয়তা হচ্ছে গাওয়া খেজুর চা। ওমানের মেয়েরা বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে মেহেদি দিয়ে হাত রাঙায়।

উৎসব

ওমানের লোকেরা ঐতিহ্যগতভাবে আরবি ঘোড়া পালন করে। ঈদ উৎসব ছাড়াও বছরের শুরুতে ওমানে মাস্কাট উৎসব পালিত হয়। তখন বিভিন্ন জায়গায় নাচগানের আসর বসে। লোককৃত্য নাচ, পারফরম্যান্স, বিশেষ পোশাক এবং ওমানি পণ্য সহ- এই উৎসব একটি অসামান্য সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। আগস্ট মাসে খারিফ উৎসব পালিত হয়।

 

 

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *