গোলাপ ফুল, গোলাপ গ্রাম ও গোলাপপ্রেমীরা

ফুলের রাণী  গোলাপ পরিপূর্ণতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক এবং প্রণয়-প্রীতি-ভালোবাসার প্রতীক।  Rosaceae পরিবারের Rosa গণের দ্বিবীজপত্রী গুল্মজাতীয় গাছে গোলাপ ফুল ফুটে থাকে।  এতে রয়েছে সুগন্ধ, নান্দনিকতা। গার্ডেন রোজ নামে বিভিন্ন হাইব্রিড গোলাপ একই সাথে একই ফুলের পাপড়িতে দুই বা ততোধিক রঙের হয়। সৌন্দর্য ও সুবাসের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত গোলাপের আদি নিবাস এশিয়ায়। কিছু প্রজাতির আদি বাস ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, ও উত্তরপশ্চিম আফ্রিকা মহাদেশে। একটি গাছ থেকে সাত থেকে ১০ বছর পর্যন্ত পর্যাপ্ত ফুল মেলে। গোলাপ একটি সম্পূর্ণ ফুল অর্থাৎ এতে বৃতি, দল, পুংকেশর, গর্ভকেশর প্রভৃতি ফুলের সবকটি অংশই নির্দিষ্ট সংখ্যায় আছে।

বিভিন্ন জাতের গোলাপ

তিনরঙা গোলাপ, রঙধনু গোলাপ, কাঠগোলাপ, লাল গোলাপ, কালগোলাপ, গোলাপী গোলাপ, হলুদ গোলাপ, সাদা গোলাপ, সবুজ গোলাপ, খয়েরি গোলাপ, দুই রঙা ফুল আইক্যাচারসহ প্রায় ১৫০ প্রজাতির বিভিন্ন বর্ণের গোলাপ ফুল রয়েছে। কয়েক জাতের বিদেশী গোলাপ হচ্ছে- ১. রানি এলিজাবেথ (গোলাপি), ২. ব্ল্যাক প্রিন্স  (কালো), ৩. ইরানি (গোলাপি), ৪. মিরিন্ডা (লাল), ৫. পাপা মিলাঁ, ৬. আইসবার্গ, ৭. রোজ গুজার্ড, ৮. বেংগলি, ৯. কুইন এলিজাবেথ, ১০. জুলিয়াস রোজ, ১১. ডাচ গোল্ড, ১২. সানসিল্ক, ১৩. কিংস র‌্যানসন, হাজারী গোলাপ উল্লেখযোগ্য। কয়েক জাতের বাংলাদেশী গোলাপ হচ্ছে- ১. ফাতেমা ছাত্তার ২. মল্লিক ৩. রাহেলা হামিদ ৪. পিয়ারী ৫. ভাসানী ৬. শের-এ-বাংলা ৭. ১৯৫২ ৮. জয়ন্তি, ৯. শিবলী ।

গোলাপের চাষাবাদ

দিনে অন্ত:ত ৫ ঘণ্টা সূর্যালোক পায় এমন আবহাওয়া গোলাপের জন্য উপযুক্ত। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা গোলাপের পক্ষে উপযুক্ত। তবে এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রাও গোলাপ গাছ সহ্য করতে পারে। বাতাসের আর্দ্রতা ৭৫ শতাংশ গোলাপ চাষের জন্য আদর্শ।  জমির অম্লতার মাত্রা ৫.৫ থেকে ৬.৬ হতে হবে। গোলাপ গাছ কার্টিং, গ্রাফটিং, বাডিং পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। বাণিজ্যিক ভাবে টি-বাডিং পদ্ধতিতে গোলাপের চারা তৈরি করা হয়।  অতি বৃষ্টিযুক্ত স্থানে রোপণ করা যাবে না। ফুল বেশি ধরে সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাসে। তবে আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত লাগানোর ভালো সময় আর সর্বোত্তম সময় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। ফুলের জন্য মে-জুন মাসে ৬০-৯০ সে.মি গভীর বেড তৈরি করে নিতে হয়। যেকোনো উর্বর ও নিষ্কাশিত জমিতেই গোলাপ ভালো জন্মে। বিকালের পর এবং সন্ধ্যা নামার আগে গোলাপ গাছ লাগানোর সর্বোত্তম সময়।

গোলাপ ফুলের চাষ পদ্ধতি

গোলাপের বংশ বিস্তারের জন্য পরিস্থিতিভেদে শাখা কলম, দাবা কলম, গুটি কলম ও চোখ কলম প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়ে থাকে। নতুন নতুন গোলাপের জাত উদ্ভাবনের জন্য বীজ উৎপাদন করে তা থেকে চারা উৎপাদন করা হয়। গোলাপ রোপণের জন্য উর্বর দোআঁশ মাটির জমি নির্বাচন করা সবচেয়ে উত্তম। যেখানে জলাবদ্ধতা হয় না অথবা ছায়াবিহীন উঁচু জায়গা, এরূপ জমিতে গোলাপ ভালো জন্মায়। কাঁটা ফুল হিসেবে চাষের জন্য হাইব্রিড-টি ব্যবহৃত হয়। প্রচলিত প্রজাতিগুলি হল মেলোডি, ডার্লিং, গ্ল্যাডিয়েটর, সুপারস্টার, মন্টেজুনা, ভিভালডি। গ্রিনহাউসে চাষের উপযুক্ত প্রজাতি হল গ্র্যান্ডগালা, ফার্স্টরেড, হ্যাপিনেস, কনফেট্টি, হোয়াইটপার্ল, এস্কিমো ইত্যাদি।

জমিকে প্রথমে ভালোভাবে চাষ দিতে হয়। আগাছা ও পাথর পরিষ্কার করে নিতে হয়। মাটিকে এক সপ্তাহ রোদ খাইয়ে নিয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার যেমন কেঁচো সার, গোবর সার বা কম্পোস্ট মেশাতে হয়। বোনমিল বা ফিশমিল গোলাপের পক্ষে খুবই উপকারী। গোলাপ গাছ লাগানোর জন্য জমি সমতল করার পর ১০০ সেন্টিমিটার x ৭ সেন্টিমিটার দূরত্বে গর্ত খুঁড়তে হবে। গর্তগুলি ৩০ সেন্টিমিটার x ৩০ সেন্টিমিটার x ৩০ সেন্টিমিটার হতে হবে। এই গর্তে এমন ভাবে চারা লাগাতে হবে, যাতে কেবল মাত্র মূল অংশ মাটির নীচে থাকে এবং গ্রাফটিং বা বাডিং অংশ মাটির উপরে থাকে।

গোলাপের পরিচর্যা

শীতকালে সেচের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হয়। ফুলের উৎপাদন ও গুণমান বাড়ানোর জন্য গাছগুলিকে সময় সময় ছেঁটে ফেলতে হবে। শীতকালে গাছগুলির পুরনো ডাল ছেঁটে ফেলতে হবে এমন ভাবে, যাতে বসন্তে নতুন পুষ্ট ডাল বের হয়।  গোলাপ ফুল কুঁড়ি অবস্থায় তোলা হয়, যখন প্রথম পাপড়িটি একটু খুলেছে। ভোরে ফুল সংগ্রহ করতে হবে। ধারালো ছুরি দিয়ে ৬০ থেকে ১০০ সেমি পর্যন্ত লম্বা ডাঁটি রেখে ফুলগুলি তুলতে হবে। পাতা-সহ প্রায় কুড়িটি ফুল বান্ডিল করে পাতলা কার্ডবোর্ড দিয়ে মুড়েয়ে রাখতে হবে, যাতে ফুলে আঘাত না লাগে। প্রাথমিক অবস্থায় শিকড়ে হালকা পানি দিতে হয় নিয়মিত।

কীট দূরীকরণের কীটনাশক হিসেবে জমিতে ২ মি.লি ফলিথেয়ন, ১০% বি.এইচ.সি, ১০% ডিডিটি,১ মি.লি মেলাথিয়ন,পাউড্রে মিডলিউ ও ব্ল্যাক স্পট স্প্রে প্রতি লিটার পানিতে দু’গ্রাম করে মিশিয়ে জমিতে দিলে কীটপতঙ্গ সংক্রমণ কম হয়। প্রতিবছর গোলাপ গাছের ডালপালা ছাঁটাই করলে গাছের গঠন কাঠামো সুন্দর ও সুদৃঢ় হয় এবং অধিক হারে বড় আকারের ফুল ফোঁটে।

গোলাপের গুরুত্ব

চিকিৎসাক্ষেত্রে গোলাপের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবহার। গোলাপ ভিটামিন এ,সি, বি৩ ও ই এর অন্যতম উৎস। গোলাপজল “রিলাক্সিং এজেন্ট” হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা স্নায়ুগুলোকে সতেজ করে। গোলাপ পাপড়ির চা আলসার, অ্যাজমা, ডিহাইড্রেশনসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময় করতে সহায়তা করে। জ্বর, র‌্যাশ প্রতিরোধ করে। গোলাপ চা পিত্তথলি ও যকৃতকে ভালো রাখে। এছাড়া গোলাপজল চুলের বৃদ্ধির জন্য উপকারী।

 গোলাপের ব্যবহার

গোলাপ ফুলের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। গোলাপের পাপড়ি থেকে জ্যাম ও জেলি প্রস্তুত করা হয়। সুগন্ধির জন্য গোলাপজল ব্যবহার করা হয়। গোলাপ ফুলের সুবাসকে কাজে লাগিয়ে পারফিউম ও সাবানসহ বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী তৈরি করা হয়। গোলাপে গেনারিয়ল নামের অ্যারোম্যাটিক অ্যালকোহল জাতীয় পদার্থ সুগন্ধের জন্য দায়ী। মেয়েদের অন্তর্বাস ও ন্যাপকিনেও গোলাপের সুগন্ধ ব্যবহার করা হয়। অর্নামেন্টারি উদ্ভিদ হিসেবে গোলাপের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। গোলাপ থেকে তেলও উৎপাদিত হয়। মিষ্টি সাজাতে বা গোলাপের শুকনো পাপড়ির শরবত তৈরিতে এর ব্যবহার রয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গোলাপ ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে অতিথিদের সম্মান ও  সমাদর করা হয়।

গোলাপের ক্ষমতা 

যে নামেই ডাকুন গোলাপের গুণ বদলাবে না। খ্রিস্টিয় জগতে এই ফুলের আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও বিপুল। কিন্তু এই গোলাপেরই অনেক নিরাময় গুণ রয়েছে। গোলাপের পাপড়ি চিবিয়ে খেলেও উপকার অনেক। অনেকের মতে, এতে বাড়তি মেদ কমে। নিয়মিত সেবনে ঋতু সংক্রান্ত সমস্যাও মেটে বলে জানাচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ গাইনেকোলজি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক্স’। ডিমনেশিয়া বা ওই জাতীয় স্মৃতি ঘটিত রোগকে প্রতিহত করতে সাহায্য করে গোলাপ। জানাচ্ছে ‘জার্নাল অফ প্রিভেন্টিভ মেডিসিন’। গোলাপের গন্ধ ডিপ্রেশন কাটায়। অবসাদ দূর করতে গোলাপের নির্যাসের ব্যবহার অতি প্রাচীন। অ্যারোমাথেরাপিস্টরা জানাচ্ছেন, গোলাপের নির্যাস যৌন অক্ষমতা দূর করে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে তা যৌনস্পৃহাকে বাড়ায়। ‘জার্নাল অফ ট্র্যাডিশনাল অ্যান্ড কমপ্লিমেন্টারি মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র জানাচ্ছে, গোলাপের মধ্যে রয়েছে জীবাণু প্রতিরোধের গুণ। গোলাপের পাপড়ি চিবিয়ে খেলে তা মাইগ্রেন প্রতিরোধে কাজ করে। মাইগ্রেনের চিকিৎসায় রোজ অয়েল ব্যবহৃত হয়। গোলাপজলের উপকারিতা বহু। ত্বকের পরিচর্যার জন্য এই ভেষজের ব্যবহার অতি প্রাচীন।

রূপচর্চায় গোলাপজল

গোলাপ পাপড়িতে আছে বিভিন্ন ব্যাক্টেরিয়া রোধকারী উপাদান।যা ব্রণ থেকে ত্বককে রেহাই দেয়। ব্রণ হলে গোলাপজল ব্যবহার করলে খুব দ্রুত ব্রণ চলে যাবে। চোখের নিচে পড়া কালো দাগ দূর করতে তুলোয় গোলাপজল ভিজিয়ে চোখের ওপর কিছুক্ষণ ধরে রাখুন। ১ সপ্তাহের মধ্যে কোলো দাগ চলে যাবে। চুলের যত্নে চুলের গোড়ায় গোলাপজল লাগিয়ে কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করলে খুশকির মতো ভয়াবহ সমস্যা দূর হয়। আর চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। ফলে খুব দ্রুত চুল বড় হয়। মাথায় গজায় নতুন চুল। প্রাকৃতিক স্কিন টোনার হিসেবে গোলাপজলে কোনো বিকল্প নেই। সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পর তুলোয় গোলাপজল নিয়ে আলতো করে বৃত্তাকারে মুখ পরিষ্কার করলে রোদা পোড়া ভাব কেটে যায়, পরিষ্কার হয়ে ত্বকের নিচে জমে থাকা ময়লা।

গোলাপের জাদুকরী রহস্য

ত্বক উজ্জ্বল, টানটান ও মসৃণ করতে গোলাপফুল বেশ কার্যকর। গোলাপ জলের থেকে কাঁচা ফুলের পাঁপড়ি ত্বকের জন্য বেশি উপকারী। এই উপাদানটি ত্বকের রুক্ষতা ও কালচে ভাব দূর করে চেহারার জৌলুস ধরে রাখতে সাহায্য করে।
গোলাপ ফুলের পাপড়ি সৌন্দর্য বাড়াতে রূপচর্চায় ব্যবহার করা হয়। এতে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি আছে যা সানস্ক্রিন হিসেবে চমত্‍কার কাজ করে।বাহিরে যাওয়ার আগে শশার রসের সঙ্গে সামান্য একটু গ্লিসারিন ও গোলাপজল নিয়ে লোশন তৈরি করে মুখে লাগালে অনেক উপকার পাওয়া যাবে। সেনসেটিভ ত্বকের জন্য খুবই উপকারি।

মসৃণ ত্বকের জন্য গোলাপ তেল

মসৃণ ত্বকের জন্য গোলাপের তেল ব্যবহার করা হয়। গোলাপের মধ্যে যে প্রাকৃতিক তেল পাওয়া যায় তা ত্বকে মশ্চারাইজার ধরে রাখে।ত্বক হয়ে কোমল ও মসৃণ।

কীভাবে মুখে গোলাপের পাঁপড়ি ব্যবহার করবেন?

স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বকের জন্য নিয়মিত গোলাপফুলের রস মুখে লাগান। এটি প্রাকৃতিক টোনার হিসেবে কাজ করে, যা চেহারার বলিরেখা দূর করে ত্বককে টানটান করে।গোলাপফুলের রস ত্বককে সতেজ রাখে। দুশ্চিন্তা দূর করতে কয়েকটি গোলাপের পাঁপড়ি মুখে ঘষে কিছুক্ষণ পর ধুয়ে ফেলুন। এটি মানসিক দুশ্চিন্তা দূর করার পাশাপাশি ত্বকের রুক্ষতাও দূর করবে। যাদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও স্পর্শকাতর, তাঁরা নিয়মিত ত্বকে গোলাপফুলের এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করুন। এটি ত্বককে নরম ও মসৃণ করে।  গোলাপফুলে ভিটামিন সি রয়েছে, যা ত্বকের নতুন কোষ জন্মাতে সাহায্য করে। ত্বকের কালচে ভাব, ব্রণের দাগ ও খসখসে ভাব দূর করতে নিয়মিত গোলাপফুলের পাঁপড়ির সঙ্গে মধু মিশিয়ে মুখে লাগান। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গোলাপের পাঁপড়ি পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর এই পাঁপড়ি শিলপাটায় বেটে এর সঙ্গে চার টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার পানি দিয়ে মুখ ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।

গোলাপ ফুলের চা

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে গোলাপের চা দারুণ উপকারী। এটি ক্লান্তিনাশক ও মেজাজ ভালো করার গুণসম্পন্ন। এতে যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তা ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং হজমে সহায়ক।  শুকনো পাপড়ির সঙ্গে চায়ের গুঁড়া যোগ করে চা বানানো যায়। এ ছাড়া সতেজ গোলাপের পাপড়ি পানিতে সেদ্ধ করে চা তৈরি করতে পারেন।

গোলাপ চা ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। ক্যাফেইনমুক্ত তাই কফি বা চায়ের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। ক্ষুধানিবারক হিসেবে কাজ করে বলে ওজন বাড়ে না। শরীরে জন্য হজমশক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে । পাচকতন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়া তৈরিতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া সমস্যায় হারবাল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূত্রনালির সংক্রমণ প্রতিরোধ ছাড়াও শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান দূর করতে সাহায্য করে। শরীরের সংক্রমণ দূর করতে গোলাপের ভিটামিন সি কার্যকর। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

গোলাপ শুকিয়ে ব্যবহার

একদিনের বাসি হয়ে গেলেই পাপড়ি খুলে নিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন ঈষদুষ্ণ জলে। এতে গোলাপের গায়ে লেগে থাকা যাবতীয় রাসায়নিক ধুয়ে যাবে। এবার পাপড়িগুলি একটি পাত্রে রাখুন, তার পর তা ঢাকা পড়ে যায় এমন পরিমাণ ডিস্টিলড ওয়াটার ঢেলে দিন উপর থেকে। বেশি জল দিলে কিন্তু গোলাপজল পাতলা হয়ে যাবে। এবার পাত্রটি কম আঁচে চড়িয়ে দিন গ্যাসে। ঢাকা দিয়ে অন্তত আধ ঘণ্টা ফোটান। পাপড়ি রং হারালে গ্যাস বন্ধ করুন। ঠান্ডা হলে ছেঁকে বোতলে ভরে নিন। গাঢ় রঙের কাচের বোতলে গোলাপজল ঢেলে রাখুন, তবে বেশিদিন রাখবেন না। প্রিজ়ারভেটিভ ছাড়া প্রাকৃতিক জিনিস বেশিদিন থাকে না।

বাড়িতে তৈরি করা গোলাপ জল ও সমান পরিমাণ ডিস্টিলড ওয়াটার মিশিয়ে স্প্রে বোতলে রাখুন। তা প্রয়োজনমতো সরাসরি মুখে ছিটিয়ে নিন। সমান পরিমাণ খাঁটি গোলাপ জল আর অ্যাপেল সাইডার ভিনিগার মিশিয়ে তৈরি করুন সানবার্নের সঙ্গে লড়ার উপযোগী মিক্সচার। লস্যি, লেবুর জল বা আইসক্রিমে এই গোলাপ জল মিশিয়ে নিলে তার স্বাদ-গন্ধই বদলে যাবে ম্যাজিকের মতো!

গোলাপের ইতিহাস

প্রাচীনতম গোলাপের বয়স ২ কোটি ৬০ লক্ষ বছর থেকে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ বছর। প্রাচীনকালে গ্রীস, রোম, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে গোলাপের আবাদ ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্দর গোলাপ এসেছে প্রায় পাঁচশ বছর আগে বসরা থেকে। মোগল সম্রাট বাবর প্রথম ‘বসরা’ নামের এক গোলাপ নিয়ে এসেছিলেন। বাংলাদেশে গোলাপের উৎপাদন ও বিপণন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সালনা ও সাভারের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপকভাবে এখন গোলাপের চাষ হচ্ছে।

গোলাপ ফুল নিয়ে অনেক মিথ রয়েছে। যেমন- গ্রীক উপকথায় আছে প্রেমের দেবী ভেনাস-এর পায়ের রক্ত থেকে গোলাপের জন্ম। আরব দেশীয় কাহিনিতে আছে সাদা গোলাপকে বুলবুলি পাখি আলিঙ্গন করায় বুলবুলি পাখি গোলাপের কাটায় আহত হয়ে বুলবুলি পাখির রক্ত থেকে সাদা গোলাপ থেকে লাল গোলাপের জন্ম। গোলাপ সম্বন্ধে এইরকম অনেক গল্প আছে।

হাজার হাজার বছর আগে সম্ভবত চীনে প্রথম গোলাপের চাষ শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্যের সময় মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক গোলাপ চাষ করা হতো, প্রধানত সুগন্ধি তৈরির জন্য। এছাড়া বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠানে গোলাপের পাপড়ি ছেটানোর চল ছিল সেসময়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে গোলাপ পুল রাজ সিংহাসন দখলের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

কোন রঙের গোলাপের কী মানে

সাদা, গোলাপী, হলুদ, কমলা, পিচ প্রতিটি গোলাপের আলাদা একটি অর্থ আছে। প্রিয়জনকে ফুল দেওয়ার আগে জেনে নিন কোন ফুলের ভাষা বা আবেদন কেমন। জেনে নিন কোন রঙের গোলাপ কীসের প্রতীক। সৌন্দর্য, ভালোবাসার প্রতীক লাল গোলাপ। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, স্বীকৃতির প্রতীক গোলাপি গোলাপ। হলুদ গোলাপ বন্ধুত্ব সম্পর্কের প্রতীক। বন্ধুত্ব, দৃঢ় সম্পর্ক, বন্ধন আনন্দ, সুস্বাস্থ্য বোঝাতেও ব্যবহার করা হয়। সেই সাথে সতেজতার প্রতীক।

কমলা রং আবেগ, উত্সাহ, উদ্দীপনার প্রতীক। কাউকে কমলা গোলাপ উপহার দিয়ে বোঝাতে পারেন, আপনি পাশে আছেন। পিচ গোলাপ আরোগ্যের প্রতীক, সততা, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা বোঝাতে উপহার দিন। বিদেশে বিয়ের সময় কনের হাতে দেওয়া হয় একগুচ্ছ সাদা গোলাপ। এই ফুল নতুন জীবন শুরুর প্রতীক। মৃতহেদ, কবরের উপর সাদা গোলাপ রাখার অর্থ তাকে মিস করা, মনে করা। কাউকে মিস করলে সাদা গোলাপ পাঠিয়ে জানাতে পারেন মনের ভাষা।

নীল রঙের গোলাপ রহস্য বোঝায়, দুর্বোধ্যতার প্রতীক। শান্ত ও ফলপ্রসূতা বোঝায় সবুজ গোলাপ, এই গোলাপ ভাগ্যের প্রতীক। কালো গোলাপ মৃত্যু বা শোকের বার্তাবাহক। বেগুনি গোলাপ – র‌য়্যালিটির প্রতীক। রানিকে সম্মান জানাতে দেওয়া হয় বেগুনি গোলাপ।

গোলাপের চাহিদা

সারা বছরই দোলাপের চাহিদা থাকে। তবে বিয়ের মৌসুমে, ক্রিসমাসের সময়, ভ্যালেনটাইন্স ডে উপলক্ষে এর চাহিদা থাকে তুঙ্গে। ভালোবাসার সঙ্গীকে উপহার হিসেবে গোলাপের কদর সবচেয়ে বেশি। যখনই আমরা কাউকে ফুল উপহার দেয়ার কথা ভাবি, সবার আগে কিন্তু গোলাপ ফুলের কথাই মনে আসে।

হ্যাপি রোজ ডে ও ভালোবাসার ৭ দিন

ভালোবাসা প্রকাশের জনপ্রিয় একটি মাধ্যম গোলাপ। যা সেই আদিকাল থেকে প্রচলিত হয়ে আসছে। আর এই ভালোবাসার মাধ্যমের গুরুত্ব বোঝাতে পালিত হয় রোজ ডে বা  গোলাপ দিবস। ৭ ফেব্রুয়ারি ‘রোজ ডে’ পালিত হয়, এদিন ভ্যালেন্টাইন’স উইক অর্থাৎ প্রেমের সপ্তাহ শুরু হয়।  এই দিনে পছন্দের মানুষকে ভালোবেসে গোলাপ দেয়। ভালোবাসার সপ্তাহ ভালোবাসা দিবসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম দিন হলো রোজ ডে। এদিন একে অপরের ভালোবাসার কথাগুলো তাদের মনের মানুষের মাঝে প্রকাশ করে থাকে গোলাপ ফুলের মাধ্যমেই।

গোলাপ গ্রামে একদিন

সাভার বিরুলিয়ায় সাদুল্লাপুর গ্রামে  বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষই যুক্ত আছেন গোলাপ ফুল চাষ ও এ ব্যবসার সঙ্গে। এখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎসই এটি।  প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে গোলাপ গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসছেন ফুলপ্রেমী মানুষ। ফুলের বাগানে এসে যেন চোখের ক্ষুধা মিটিয়ে বুকভরা আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তারা।  রাস্তার দুই ধারে প্রচুর গোলাপ বাগান। বাগান জুড়ে গোলাপের ছড়াছড়ি। শুধু গোলাপ আর গোলাপের সমারোহ।

টকটকে লাল গোলাপে সেজে গ্রামটি দাঁড়িয়ে আছে তুরাগ নদীর তীরে। চলতি পথের দু ধারে সারি সারি গোলাপ গাছ।  ভেসে আসছে চমৎকার সুবাস। পুরো গ্রামই সাজানো ফুলে ফুলে, যেন গ্রামটিই আস্ত একটি বাগান! এখানে এলে ফুল দিয়ে পছন্দমতো মুকুট বানিয়ে নিতে পারবেন। গোলাপচাষিরা অন্যান্য ফুলের সঙ্গে গোলাপ জুড়ে দিয়ে চমৎকার সব মুকুট বানিয়ে দিচ্ছেন নিমিষেই। গোলাপসহ নানান তাজা ফুল বাগান থেকেও কিনে নিতে পারবেন। অনুমতি নিয়ে  চাইলে নিজ হাতে ফুল তুলতেও পারবেন বাগানের ভেতর থেকে।  প্রকৃতি আর ফুলের সুবাসে মন ভালো হয়ে যাবে। শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ‘নামে কিছু যায় আসে না, গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সুবাস ছড়াবেই।’

দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে আলাদা পার্কিং ব্যবস্থা। ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলের পাশাপাশি অনেকে ভাড়া করা অটো নিয়ে আসছেন গোলাপ গ্রাম ঘুরতে। বেশিরভাগ গোলাপ বাগানই এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। ফলে অযাচিত ফুল নষ্টের মতো ঘটনা ঘটছে না। অনেক বাগানের সামনে বসেছে ফুলের হাট। দর্শনার্থীরা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দর্শনার্থীরা পছন্দ মতো ফুল দিয়ে বানিয়ে নিচ্ছেন মুকুট, হাত ভরে কিনছেন বাগান থেকে তুলে আনা তাজা ফুলের তোড়া।বিকেল হতেই দর্শনার্থীদের ঢল নামে গোলাপ গ্রামে।

গোলাপের ভুবন সাদুল্লাপুর

ঢাকার খুব কাছেই সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নে তুরাগ নদীর তীরে গোলাপ গ্রাম (Rose Village) সাদুল্লাপুরের অবস্থান। সাহদুল্লাপুর পুরো গ্রামটাই নানা রঙের গোলাপ ফুল দিয়ে ঘেরা। এখানে গোলাপ ছাড়াও অনেক ফুল আছে, যেমন- জারভারা, গ্লাডিওলাস। ঢাকার বেশি ভাগ ফুল চাহিদা এখান থেকে মেটানো হয়। শাহবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন ফুলের বাজারগুলোতে গোলাপের প্রধান যোগান দেন এখানকার চাষিরা।

সূত্র:  রিডারর্স ডাইজেস্ট, বোল্ডস্কাই, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়াউইকিপিডিয়া, m.dailyhunt.in, আনন্দবাজারএনডিটিভি অনলাইন

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *