ক্রিকেটের বিস্ময় শচীন টেন্ডুলকার

খাদেমুল ইসলাম : তারিখটা ছিল ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল। মুম্বাইয়ের পূর্ব বান্দ্রার সাহিত্য সাহাশ কর্পোরেটিভ হাইজিং সোসাইটিতে জন্ম হয় এক বিস্ময় বালকের। যার আলোয় শুধু ভারত নয়, পুরো ক্রিকেট বিশ্ব আলোকিত হয়েছিল। বাবার নাম রাজাপুর স্বরস্বতী ব্রাক্ষ্মন পেশায় ছিলেন একজন উপন্যাসিক। মা রাজোনি একটি জীবন বীমা কোম্পানিতে কাজ করতেন।

সেই বিস্ময় বালক হলেন শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। ক্রিকেটে যাত্রা স্কুল জীবন থেকেই। স্কুল ক্রিকেটেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। ভালো খেলার জন্য তার ছিল নিরলস অনুশীলন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার প্রতিভা ছড়িয়ে পড়ে আশ-পাশের এলাকায়। স্কুল ক্রিকেটে অসাধারণ পারফরম্যান্সের সুবাদে অল্প বয়সেই তিনি ক্লাব ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পান।

জন ব্রাইট ক্রিকেট ক্লাব এক সময় তাকে দলে নেয়।  ১২ বছর বয়সে ক্লাবের হয়ে কাঙ্গা লিগে তার অভিষেক হয় তার। সেখান থেকে পরে তিনি সুযোগ পান ভারতের ক্রিকেট ক্লাবে। ১৩ বছর বয়সে মুম্বাইর স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে প্রথম শতক হাঁকান। ১৪ বছর বয়সে শচীনের ব্যাটিংয়ে অরুচি ধরে। হঠাৎ ব্যাটিং ছেড়ে বোলিংয়ের দিকে মনযোগ চলে যায় তার। পেসার হওয়ার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু অনুশীলনে খুব ভালো পারফরম্যান্স না দেখাতে পারায় অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেস বোলার ডেনিস লিলির পরামর্শে আবারও ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেন।

১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে কিশোর শচীন প্রথম ভারতের মর্যাদাকর রঞ্জি ট্রফিতে খেলার সুযোগ পান। ১৫ বছর ২৩২ দিন বয়সে ভারতের সবচেয়ে কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক ম্যাচেই গুজরাটের বিপক্ষে সবচেয়ে কম বয়সে শতক হাঁকান তিনি। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি ভারতের ব্যাটিং দেবতাকে। ’৮৮-৮৯ থেকে শুরু করে ২০১২-১৩ মৌসুম পর্যন্ত তিনি মোট ২৯৯টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছেন। করেছেন ২৪ হাজার ৭০১ রান। যার মধ্যে ৭৯টি শতক এবং ১১২টি অর্ধশতক রান রয়েছে। সর্বোচ্চ স্কোর অপরাজিত ২৪৮। গড় ৫৭.৯৮।

এরপর ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে ১৬ বছর ২২৩ দিন বয়সে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার টেস্ট ক্রিকেটে তথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। ১৫ নভেম্বর ১৯৮৯ পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে এবং ২৪ ডিসেম্বর অভিষেক হয় ওয়ানডেতেও। ১৯৯৫ সালের ২৪ মে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন তার চেয়ে ছয় বছরের বড় অঞ্জেলিকে।

১৯৯৬ সালে ভারত দলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। অধিনায়ক হিসেবে শচীনের তত্ত্বাবধানে ভারত ২৫টি টেস্ট খেলে ভারত। যার মধ্যে মাত্র চারটিতে জয় পায়। ৯টিতে হার মানে। আর বাকি ১২টিতে ড্র। ওয়ানডেতে ৭৩টি ম্যাচে ভারতকে নেতৃত্ব দেন। জয় পান ২৩টিতে। হার মানেন ৪৩টিতে। টাই হয় দুটি ম্যাচ। ফল হয়নি ৬টিতে। ১৯৯৬ সালে শচিন অধিনায়কের দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের পারফরম্যান্স খারাপ হতে থাকে। ১৯৯৭ সালে দল বেশ বাজে পারফরম্যান্স করে। ১৯৯৯ সালে শচিনকে ভারতের অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পড়ানো হয় দ্বিতীয়বারের মতো।

অধিনায়কত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর ২০০১ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ভালোই পারফরম্যান্স করেন শচীন। বল এবং ব্যাট হাতে সমানতালে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কোলকাতা টেস্টে শেষ দিন বল হাতে তিন উইকেট তুল নেন। ম্যাথু হেইডেন, অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো ব্যাটসম্যানদের নিজের শিকারে পরিণত করেন। যারা আগের টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন।

২০০২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে ৭৯ রান করেন এবং দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১১৭ রানের একটি দারুণ ইনিংস খেলেন। পোর্ট অব স্পেন এ শচীন তার ক্যারিয়ারের ৯৩তম টেস্টে ২৯তম সেঞ্চুরি হাকান। যা তাকে স্যার ডন ব্যাডম্যানের টেস্টে ২৯ সেঞ্চুরি ছুঁয়ে ফেলার সুযোগ এনে দেয়। এরপর চলে ক্যারিয়ারের ক্যারিয়ারের উন্থান-পতন। যা ২০০৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। ২০০২ সালের আগস্ট মাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে শচিন তার ক্যারিয়ারের ৩০তম টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পান। যার মাধ্যমে তিনি ডন ব্র্যাডম্যানকে ছাড়িয়ে যান। এটি ছিল তার ৯৯তম টেস্ট ম্যাচ।

২০০৩ বিশ্বকাপে ১১ ম্যাচে ৬৭৩ রান করেন। যা ভারতকে ফাইনালে উঠতে সহায়তা করে। কিন্তু ফাইনালে তারা অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে যায়। শচীন ম্যান অব দ্যা টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হন। ওই বছর ওয়ানডে ক্রিকেটে দারুণ পারফরম্যান্স করতে থাকেন। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের মধ্যকার ত্রিদেশীয় সিরিজে তিনি দুটি সেঞ্চুরি হাঁকান।

২০০২ সাল থেকে ২০০৬ এবং ২০০৭ সালের কিছুটা সময় শচিনের ক্যারিয়ারের অবনমণ ঘটে। এই সময়ে ঘরের মাঠে দর্শকদের দুয়োধ্বনি পর্যন্ত শুনতে হয়। কিন্তু ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক শচিন দমে যাননি। ২০০৭ বিশ্বকাপের পর থেকেই নিজের ধারাবাহিক ফর্মটা ফিরে পান মাস্টার ব্লাস্টার। তবে বিশ্বকাপে শচিনের পারফরম্যান্স ছিল হতাশাজনক। তার চেয়েও বেশি হতাশাজনক ছিল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই ভারতের বিদায় নেয়াটা।

বিশ্বকাপের পর আবারো তার ছন্দ ফিরে পান। ফিরে পান আগের ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের বিপক্ষে নিজের সেরাটা দিয়ে ম্যান অব দ্য সিরিজ হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফিউচার কাপে ৯০ এর উপরে টানা দুটি ইনিংস খেলেন। সেখানেও ম্যান অব দ্য সিরিজ হন। ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে সিডনিতে টেস্ট ক্যারিয়ারের ৩৮তম সেঞ্চুরির দেখা পান। সেখানে তিনি অপরাজিত থাকেন ১৫৪ রানে।

তার আগে ২০০৭ সালে জুলাই মাসে নটিংহ্যামশায়ার টেস্টে তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে ১১ হাজার রান করেন। একদিনের ক্রিকেটেও দারুণ খেলতে থাকেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫৩.৪২ গড়ে ২৭৮ রান করে সর্বোচ্চ স্কোরার হন। ২০০৭ সালে শচিন ৯০ থেকে ১০০ এর মধ্যে সাতবার আউট হন। সাতবারের মধ্যে তিনবারই ছিল ৯৯ রানে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৭ বার ৯০ এর উপরে রান করে আউট হয়েছেন তিনি।

বিদায় নেয়ার আগে যে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে দ্বিশতক রান করেছেন। ক্রিকেট বিশ্বের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে করেন সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি (টেস্টে ৫১টি এবং ওয়ানডেতে ৪৯টি)। টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ড ১৫ হাজার ৬৪৩ রান এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে রেকর্ড ১৮ হাজার ৪২৬ রান করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই রেকর্ড কেউ  স্পর্শ করতে পারেননি।

এখানেই শেষ নয়, প্রথম কোনো ক্রিকেটার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন; জিতেছেন বিশ্বকাপও। টেস্ট ক্রিকেটে দ্বিশতক রয়েছে পাঁচটি। আর ওয়ানডেতে একটি। ১৯৯০ সালের ৯ আগস্ট ইংল্যান্ডের ওল্ড ট্রাফোর্ডে পেয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতক। আর ১৬ মার্চ ২০১২ বাংলাদেশের বিপক্ষে মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে তিনি পূর্ণ করেন তার শতকের শতক।

তবে শতকের শতক পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। পাড়ি দিতে হয়েছে কিছুটা বন্ধুর পথ। ৯৯তম শতকটি তিনি হাঁকিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নাগপুরে ২০১১ সালের মার্চ মাসে। আর শততম সেঞ্চুরিটি হাঁকান তিনি ২০১২ সালের ১৬ মার্চ। এই বহুল কাক্সিক্ষত সেঞ্চুরির জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩৬৯ দিন।

শেষ পর্যন্ত এশিয়া কাপে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামই তাকে উপহার দেয় শতকের শতক। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এশিয়া কাপের চতুর্থ ম্যাচে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১৩৮ বলে ১০০ করে মাইলফলক স্পর্শ করেন ‘আধুনিক ডন।’ ২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। আর নভেম্বরের ১৬ তারিখে অবসর নেন টেস্ট ক্রিকেট থেকে। এর আগে একে একে আইপিএল, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-২০ ও রঞ্জি ট্রফি থেকে অবসর নেন।

এক নজরে শচীন

নাম:  শচীন রমেশ টেন্ডুলকার

জন্ম তারিখ: ২৪ এপ্রিল ১৯৭৩ (মুম্বাইয়ে)

উচ্চতা: ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি

দল: ভারত, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, ইয়র্কশায়ার, এশিয়া একাদশ উল্লেখযোগ্য

ডাক নাম: লিটল মাস্টার, টেন্ডলিয়া

কোচ: রামাকান্ত আচরেকার

প্রথম আন্তর্জাতিক অধিনায়ক: ক্রিষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত

প্রথম শ্রেণীতে অভিষেক: মুম্বাই বনাম গুজরাট, ১৯৯৮

টেস্ট অভিষেক: পাকিস্তানের বিপক্ষে, ১৫ নভেম্বর ১৯৮৯

ওয়ানডে অভিষেক: পাকিস্তানের বিপক্ষে, ১৮ ডিসেম্বর ১৯৮৯

প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি: ১১৯*, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে, ১৯৯০

প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি: ১১০, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৯৪ সালে

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published.