ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহ্যের দেশ উজবেকিস্তান

আনিসুর রহমান এরশাদ

মুসলমান অধ্যুষিত মনোরম দেশ উজবেকিস্তান। মধ্য এশিয়ার বৃহৎ প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত আর রুক্ষ-শুষ্ক দিগন্ত-বিস্তৃত মরুভূমির দেশ। রয়েছে উষ্ণ মরুভূমির তপ্ত বালির ছোঁয়া। বরাফাচ্ছাদিত সুন্দর পর্বতের চূড়ায় আরোহণের সুযোগ। সেখানে গরমের সময় প্রবল উত্তাপ আর শীতকালে পারদ নেমে যায় শূন্যের অনেক নিচে। তারপরও পরিষ্কার নীল আকাশ এবং তুষার-সাদা মেঘের আকর্ষণীয় সৌন্দর্য দেখে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ছেন বিদেশি পর্যটকরা।

এক নজরে

রাজধানী ও বৃহত্তম শহর: তাসখন্দ
রাষ্ট্রভাষা: উজবেক
মুদ্রা : উজবেকিস্তানি সোম

জনসংখ্যা: ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৮০ হাজার
রাষ্ট্রপতি: শ্যাভক্যাত মিরজিয়য়েভ
প্রধানমন্ত্রী: আব্দুল্লাহ নিগমাতোভিচ আরিপভ

অবস্থান

দেশটির পশ্চিম ও উত্তরে কাজাখস্তান, পূর্বে কিরগিজস্তান, দক্ষিণ-পূর্বে তাজিকিস্তান, দক্ষিণে আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। পশ্চিম অংশে দেশটির প্রায় ৩৭% এলাকা নিয়ে স্বায়ত্বশাসিত কোরাকালপোগ প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। রয়েছে ১২টি প্রদেশ। উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রাজধানী ‘তাসখন্দ’। ৪৪৭৪০০ বর্গকিলোমিটার। ৮০% এলাকা সমতল মরুভূমি। পূর্বভাগে সুউচ্চ পর্বতমালা ৪,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত তিয়ান শান পর্বতমালার পশ্চিম পাদদেশ নিয়ে গঠিত। উত্তরের নিম্নভূমি কিজিল কুম নামের এক বিশাল মরুভূমি, যা দক্ষিণ কাজাকিস্তানেও প্রসারিত হয়েছে। সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল ফের্গানা উপত্যকা কিজিল কুম মরুভূমির পূর্বে অবস্থিত এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। উজবেকিস্তানের দু’টি বৃহৎ নদী আমু দরিয়া এবং সির দরিয়া যথাক্রমে তাজিকিস্তান এবং কিরগিজস্তান পর্বতমালায় উৎপন্ন হয়েছে।

 সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ

খনিজ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দেশ। বিশ্বের স্বর্ণ উৎপাদনকারী শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম। তামা মজুদের ক্ষেত্রে দশম। ইউরেনিয়াম উৎপাদনের ক্ষেত্রে সপ্তম অবস্থানে। প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে অবস্থান ১১ নম্বরে। এখনো মাটির নিচে রয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, অপরিশোধিত তেল এবং মূল্যবান হাইড্রোকার্বন।

কয়লা রুপার খনিও রয়েছে। তুলা উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম ও তুলা রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের পঞ্চম স্থানে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ অধিবাসী তুলা চাষের সাথে সম্পৃক্ত। পর্যটনের জন্য দেশটির সুনাম রয়েছে বিশ্বে। কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রেও অপ্রতিরোধ্য গতি।

জনসংখ্যা ও বৈচিত্রতা

নানাবিধ উপজাতি সম্প্রদায়, গোত্র, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বহু ভাষাভাষী মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। জনসংখ্যার ৩৪.১%-এর বয়সই ১৪-বছরের নিচে। সংখ্যাগরিষ্ঠ উজবেক অধিবাসী ৮০%। অন্যান্য জাতিসত্ত্বার অধিবাসীদের মধ্যে ৫.৫% রুশ, ৫% তাজিক, ৩% কাজাখ, ২.৫% কারাকালপাক ও ১.৫% তাতার। গড় আয়ু ৬৮ বছর (পুরুষ), ৭৪ বছর (নারী)।

ইতিহাস পরিক্রমা

অনেক শাসক, বিশ্ব বিজয়ী বীর এবং বিশ্বযুদ্ধের কুশীলবদের নানামুখী তৎপরতার নীরব সাক্ষী উজবেকিস্তান। এক সময় গ্রিকের শাসক বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার ও মঙ্গোলসম্রাট চেঙ্গিস খানের সৈন্যরা উজবেকিস্তান দখল করেছিলেন। অন্যদিকে ইরান ছাড়াও অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নেরও অংশ ছিল এই দেশ। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল।

১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট মস্কোতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দিনই উজবেকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পরদিন ১ সেপ্টেম্বর দেশটিতে স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন অনিচ্ছা সত্ত্বেও উজবেকিস্তানের স্বাধীনতা অনুমোদন করে। ১৯৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে উজবেকিস্তানের জন্ম হয়। ইসলাম করিমভ হন উজবেকিস্তান গণপ্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি। ১৯৯২ সালের ৮ ডিসেম্বর উজবেকিস্তানে নতুন সংবিধান গৃহীত হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ

ইরান থেকে আসা এবং ইরানি ভাষায় কথা বলা মানুষের বসবাসের মধ্য দিয়েই দেশটিতে জনবসতি গড়ে ওঠে। পূর্ব ইউরোপের দক্ষিণ অংশ এবং চীন আর পশ্চিমে আফ্রিকার পূর্বভাগ এবং আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ বাণিজ্যিক পথ ‘সিল্ক রুট’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। বিখ্যাত রুটের মধ্যভাগে রয়েছে দেশটি। তাই উজবেকিস্তানে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশ শুরু হয় অতি প্রাচীনকাল থেকেই।

হাজার বছরের ঐতিহ্য

দেশটিতে রয়েছে বহু পুরনো মসজিদ এবং মাজার। মেয়েদের মসজিদও রয়েছে। শিল্পকলার চরম উৎকর্ষতার নজির রয়েছে মসজিদে, মিনারে। উজবেকিস্তানে মাজারের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। জাদুঘরগুলোতে প্রায় ২০ লক্ষ প্রত্নবস্তু রয়েছে, যেগুলি মধ্য এশিয়ায় প্রায় ৭০০০ বছর ধরে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। যে কারো চোখ জুড়িয়ে যাবে উজবেকিস্তানের হাজার বছরের ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখে।

অযুত সম্ভাবনাময় পর্যটন

উজবেকিস্তানে পর্যটন অযুত সম্ভাবনাময়। বিশ্ব মুসলিমদের জন্য পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হতে চায় দেশটি। মুসলিমদের আকর্ষণ করার মাধ্যমে দ্বিতীয় মক্কা হিসেবে পরিচিতিও পেতে চায়। মুসলিম পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য দেশটির আবাসিক হোটেলের রুমগুলোয় পবিত্র কুরআনের পাণ্ডুলিপি, জায়নামাজ, এবং কেবলানামা (কম্পাস) রাখা হয়েছে। রাস্তার পাশে নতুন নতুন মসজিদও নির্মাণ করা হয়েছে।

উজবেকিস্তানের ভাষা

উজবেকিস্তান বহুজাতিক দেশ। স্বাধীনতার পর উজবেক রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি পায়। উজবেক ভাষায় দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (৭৪%) লোক কথা বলে। প্রায় ১৪.২% লোক রুশ ভাষায় এবং প্রায় ৪.৪% লোক তাজিকি, ২.৭% খোয়ার ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলিতে থেকে আগত তুর্কমেন, কাজাক ওকিরঘিজ ভাষা এখানে প্রচলিত। কোরিয়ান, ইংরেজি, জার্মান, তাজিক এবং তুর্কিসহ বেশ কয়েকটি অন্যান্য ভাষাও শুনা যায়।

সংস্কৃতি

মসজিদগুলোর মিনার দেড় হাজার বছর ধরে তৌহিদি সভ্যতার নিদর্শন প্রদর্শন করছে। কয়েক শতাব্দী ধরে, উজবেকিস্তানের বাসিন্দারা তাদের দানশীলতা এবং সৌহার্দ্যের জন্য বিখ্যাত। অতিথি হওয়া বা কাউকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা উজবেকিস্তানের একটি বড় বিষয়। রয়েছে সরাইখানা, ভিন্ন স্বাদের উজবেক খাবার আর সেইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ব্যালে নৃত্য। বিশ্ব চলচ্চিত্রেও পিছিয়ে ছিল না উজবেকিস্তান। নব্বই দশক পর্যন্ত তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসব ছিল মর্যাদাপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান। উজবেকিস্তানে পারিবারিক সংহতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত দৃঢ়।

শিক্ষার উচ্চ হার

শিক্ষার উচ্চ হার ও সোভিয়েত শিক্ষার প্রভাব প্রবল। ৯৯% অধিবাসী শিক্ষিত। সরকার বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় ভূমিকা রাখছেন। রাজধানী তাসখন্দের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ৪০ হাজার দুষ্প্রাপ্য ইসলামি বইয়ের পাণ্ডুলিপি আছে।

প্রধান ধর্ম ইসলাম

জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্ম ইসলাম। অধিবাসীদের ৮৮% মুসলিম ধর্মাবলম্বী (সুন্নি)। পূর্বাঞ্চলীয় অর্থোডক্স ৯ শতাংশ, ৩% কোরীয় খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, বাহাইসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। অবস্থান করছে পাঁচ হাজারেরও কম ইহুদি।

খাদ্য

প্রচুর পরিমাণে শস্যের চাষ হয়। এতিহ্যবাহী উজবেক রুটি ও নুডলস গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। উজবেক রন্ধনশৈলী নুডলসে সমৃদ্ধ। প্রচুর পরিমাণে ভেড়া থাকায় মাটন খুব জনপ্রিয় মাংস। চাল, টুকরা মাংস, কোঁচানো গাজর এবং পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি পালোভ একটি প্রধান খাবার। অন্যান্য খাবারের মধ্যে রয়েছে: শরপা, চর্বিযুক্ত মাংস এবং তাজা শাকসব্জি দিয়ে তৈরী স্যুপ, নরেন এবং ল্যাগম্যান; ম্যান্টি, চুচভাড়া এবং সোমসা; ডিমলামা এবং জিভে পানি আনা বিভিন্ন স্বাদের কাবাব।

রাজনীতি

উজবেকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকারপ্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকাক্ষিক আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। উজবেকিস্তানে সরকারী পদপ্রাপ্তি রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ নয়, বরং কে কোন গোত্রের, তার উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব

এ দেশ বহু মুসলিম মনীষীর স্মৃতিধন্য। বিরল প্রতিভা বিখ্যাত ঐতিহাসিক আল বিরুনি, তুলনাহীন আল তিরমিজি (রহ.), ইমাম নাসাই (রহ.) অসাধারণ চিকিৎসক ইবনে সিনা, ইতিহাসখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব ইমাম আল বুখারি (রহ.) এর জন্মভূমিতে রয়েছে আমির তিমুরের অমূল্য অবদান।

ইবনে সিনা, আবু রায়হান, ওমর খৈয়াম, আল বেরুনি, আলজামিদের মতো জ্ঞানীগুণি ব্যক্তি এক সময় সমরখন্দকে সমৃদ্ধ করেছে। বুখারায় শায়েখ বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.) আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।

পূর্ব-পশ্চিমের সেতুবন্ধন তাসখন্দ

রাজধানী তাসখন্দ আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। প্রাচীন ঐতিহ্য আর আধুনিকতা এবং পূর্ব-পশ্চিমের সেতুবন্ধন শহরটি। মাজার, মসজিদ আর সমাধিসহ রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার অসংখ্য নির্দশন। এখানে রয়েছে পৃথিবীর প্রথম দিকের চারটি হাতে লেখা কোরান শরিফের একটি। তাসখন্দের হোটেলগুলো পশ্চিমা কনসালটেন্সি, সৌদি রাজকীয় ও আগ্রহী এশিয়ান বিনিয়োগকারীদের ভিড় বাড়ছে।

বহু সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র সমরখন্দ

সমরখন্দ উজবেকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। ১৩৪৯ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সমরখন্দ ছিল উজবেকিস্তানের রাজধানী। সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বিচারে পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শ্রেষ্ঠ প্রদেশ। মসজিদ, প্রাসাদ, উদ্যান এবং স্থাপত্যে রয়েছে।

এখানে প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, মঙ্গোলীয় ও ইরানি সংস্কৃতির স্রোতধারা মিলিত হয়েছে। সমরখন্দ প্রাচ্যের রোম হিসেবে পরিচিত। ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য সমরখন্দের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ২০০১ সালে ইউনেসকো ২৭৫০ বছরের প্রাচীন সমরখন্দকে বহু সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র বা ক্রসরোড অব কালচার হিসেবে আখ্যায়িত করে। সমরখন্দকে প্রাচ্যের রত্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইউরোপীয়দের কাছে সমরখন্দ বিজ্ঞানীদের বিচরণক্ষেত্র নামে পরিচিত।

১৩৩০ সালে ইবনে বতুতা সমরখন্দ পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি এটিকে অন্যতম সেরা এবং শ্রেষ্ঠ শহর হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন। এখনো স্থানটির সৌন্দর্য অত্যন্ত নিখুঁত, সাংস্কৃতিক আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। সুবিশাল বন্দর, দুর্দান্ত প্রাসাদ, ফিরোজা গম্বুজ এবং হাজার হাজার নীল টাইলস কারুকার্য স্থাপত্যের অপরুপ শোভা।এ যেন এক অভিজাত নীল শহর। ইসলামী ঐতিহ্যের সৌন্দর্য যেন মিশে রয়েছে সমগ্র প্রদেশটিতে।

আলেকজেন্ডার দ্য গ্রেট সমরখন্দে এসে বলেছিলেন, ‘আমি এই শহরের সৌন্দর্য সম্পর্কে আগে যা শুনেছি তা সত্য হলেও, বাস্তবে শহরের সৌন্দর্য আরও অনেক বেশি সুন্দর ও রাজকীয়।’ এখনো শহরটি চোখ জুড়ায়, মন ভুলায়। সমরখন্দে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা রেজিস্তান স্কয়ার তথা একটি বালুকাময় জায়গা। বিশাল পাবলিক স্কোয়ারটির তিনদিক ধর্মীয় কমপ্লেক্স দ্বারা পরিবেষ্টিত।

আব্বাসীয়দের শাসনামলে সমরখন্দই ছিল মধ্য এশিয়ার রাজধানী এবং ইসলামী সভ্যতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ৮ম শতকের শুরুর দিকে আরবেরা এটি বিজয় করে এবং এটি ইসলামী সংস্কৃতির একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ নগরীর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শাহী জিন্দা মাজার, সম্রাট তৈমুর লং নির্মিত সমাধি, জ্যোতির্বিদ উলুংবেক ও কুসাম ইবনে আব্বাস-এর সমাধি এবং হাদীস সংগ্রহকারী ইমাম আল বোখারির মাজার।

ঐতিহাসিক স্থাপনা বিবি খানম মসজিদ

সমরখন্দ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনা বিবি খানম মসজিদ। ১৩৯৯ সালে বিবি খানম মসজিদ নির্মাণ হয় অত্যন্ত দামী পাথর দিয়ে। ভারত থেকেও, কারিগর এবং পাথর খোদাইকারী মসজিদের গম্বুজটির নকশা তৈরি করেছিলেন, এটি অন্যান্য ভবনের মধ্যে এটির স্বাতন্ত্র্যতা এনে দিয়েছিল।

১৯৭৪ সালে উজবেকিস্তান সরকার এই মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করে। এই মসজিদের উপরের প্রধান গম্ভুজের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪০ মিঃ এবং এর প্রবেশদ্বার উচ্চটায় ৩৫ মিঃ। এই মসজিদের প্রাঙ্গনে মধ্যে একটি বড় মার্বেল পাথরের তৈরী কোর’আন শরীফ রয়েছে।

দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন রেগিস্তান

রেগিস্তানের কাঠামো ইসলামি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত তিনটি মাদ্রাসাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। রেগিস্তান চত্বরের তিনটি মাদ্রাসা হল উলুগ বেগ মাদ্রাসা, তিলইয়া-কুরি মাদ্রাসা ও শের-দুর মাদ্রাসা । উলুগ বেগ মাদ্রাসা মধ্যযুগের একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।

দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর নির্দশন হিসেবেও এটি সুখ্যাত। তৈমুরীয় সুলতান উলুগ বেগ ১৪২০ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সমসাময়িক স্থাপত্যকলা ও সংস্কৃতির বিকাশে উলুগ বেগ মাদ্রাসার অবদান অনস্বীকার্য।

বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বুখারা

বুখারা জেরফ্শন নদীর তীরে এক মরূদ্যানে, তুর্কমেনিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। বোখারার আশেপাশের অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস, তুলা, ফল এবং রেশম উৎপাদিত হয়। এখানে বস্ত্র, কার্পেট, এবং পশমের কারখানা আছে।

বোখারাতে ৯ম শতকের স্থাপত্য নিদর্শনের মধ্যে আছে অনেকগুলি মসজিদ, আর্ক নামের একটি দুর্গ, এবং ইসমাইল সামানির সমাধি। বুখারার ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলটিকে ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়। বুখারা নগরীতে ৩৫০টি মসজিদ ও ১০০টি মাদ্রাসা আছে। খ্রিস্টীয় ১ম শতকে বুখারা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৮ম শতকে আরবরা জয় করার আগেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।

পরিবার.নেট

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *