এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থল আফগানিস্তান

আনিসুর রহমান এরশাদ

সমৃদ্ধ ইতিহাসের উত্তরাধিকার সার্কভুক্ত দেশ আফগানিস্তান। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিস্থল। অনেক সংস্কৃতির মিলনস্থল। দেশটিতে মানুষের বসতির ইতিহাস ৫০ হাজার বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত দেশটিকে বলা হয় এশিয়ার হৃদপিণ্ড। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সুউচ্চ পর্বতমালার দেশটিতে সমুদ্র উপকূল না থাকলেও নদী বা হ্রদের কমতি নেই কোনো।

কাবুল উপত্যকার সৌন্দর্য জগদ্বিখ্যাত। সম্পূর্ণভাবে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তান একসময় পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য ছিল। আফগানদের প্রায় ৯৯ শতাংশই মুসলিম। আফগানদের একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে যা তাদের গভীর ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজ জানাব বিভক্ত জাতিসত্তার দৃঢ়তম বন্ধনের ভিত্তি যেখানে ধর্ম এমন দেশটি সম্পর্কে নানান তথ্য।

একনজরে আফগানিস্তান

ইসলামিক রিপাবলিক অব আফগানিস্তান
রাজধানী ও বৃহত্তর শহর: কাবুল
সরকারি ভাষা: পশতু, দারি (ফার্সি)
সরকার: ইসলামী প্রজাতন্ত্র

রাষ্ট্রপতি: আশরাফ গনি
আয়তন: ৬ লাখ ৫২হাজার ৮৬৪ বর্গকিমি
জনসংখ্যা: ৩ কোটি ৮৯ লাখ ২৮ হাজার ৩৪৬ জন
মুদ্রা: আফগানি (এএফএন)

অবস্থান

দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। আফগানিস্তানের দক্ষিণে পাকিস্তান, পূর্বে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর, পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে চীন। আফগানিস্তান একটি রুক্ষ এলাকা যার অধিকাংশ এলাকা পর্বত ও মরুভূমি আবৃত। শুধু পার্বত্য উপত্যকা এবং উত্তরের সমভূমিতে গাছপালা দেখা যায়। এখানকার গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া গরম ও শুষ্ক এবং শীতকালে প্রচণ্ড শীত পড়ে।

ইতিহাস

তৃতীয় ব্রিটিশ-আফগান যুদ্ধশেষে আফগানিস্তান যুক্তরাজ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯১৯ সালের ৮ আগস্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানে এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিপ্রায়ে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শুরু হয়।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং এর সাথে সাথে দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুলের দখল নেয়। ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং ২০০১-এর শেষে তালেবানদের উৎখাত করে।

২০০৪ সালে সংবিধান নতুন করে লেখা হয় এবং একটি রাষ্ট্রপতি-ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চালু হয়। ২০০৪ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথম সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

আফগানিস্তানে অনেক সাম্রাজ্য ও রাজ্য ক্ষমতায় এসেছিল, যেমন গ্রেকো-বারট্রিয়ান, কুশান, হেফথালিটিস, কাবুল শাহী, সাফারি, সামানি, গজনবী, ঘুরি, খিলজি, কারতি, মুঘল, ও সবশেষে হুতাক ও দুররানি সাম্রাজ্য। গজনীর রাজা মাহমুদ ৯৯৮ থেকে ১০৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ এলাকা শাসন করেন এবং তার সময়েই আফগানিস্তানে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। গজনী সাহিত্য ও শিল্পের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

১২২০ সালে মঙ্গোল সেনাপতি চেঙ্গিস খান দেশটির অশেষ ক্ষতিসাধন করেন। ১৪শ শতাব্দীর শেষে তৈমুর লং আফগানিস্তান জয় করেন ও ভারতে অগ্রসর হন। ঘুরিদ থেকে তিমুরীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে এখানে ইসলামী স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে। এসময় তৈরি বহু মসজিদ ও মিনার আজও হেরাত, গজনী ও মাজার-ই-শরিফ দাঁড়িয়ে আছে। জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবর ১৫০৪ সালে কাবুল দখল করেন এবং তারপর ভারতে গিয়ে মুঘল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র

বহু প্রাচীন বাণিজ্য ও বহিরাক্রমণ এই দেশের মধ্য দিয়েই সংঘটিত হয়েছে। এ দেশের ওপর দিয়ে চলে গিয়েছে প্রাচীন সিল্করোড নেটওয়ার্কের অধীন কয়েকটি সড়ক। পশম, স্বর্ণ, রেশম ও মসলার মতো প্রাচীন যুগের সবচেয়ে দামি পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল আফগানিস্তান।

এশিয়ার প্যারিস

গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে একের পর এক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার দেশটিতে এনে দিয়েছিল আধুনিকতার স্পর্শ। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আধুনিক হয়ে উঠছিল আফগান শহরাঞ্চল। বিশেষ করে রাজধানী কাবুলে এ সমৃদ্ধি চূড়ায় উঠে দাঁড়ায়। শহরটি পরিচিতি পায় ‘এশিয়ার প্যারিস’ হিসেবে।

আফগান

আফগানিস্তান শব্দটির অর্থ ‘আফগান (তথা পশতুন) জাতির দেশ’। বর্তমানে আফগান বলতে রাষ্ট্রের সকল নাগরিককেই বোঝায়। আফগানিস্তানে কমপক্ষে ১৪টি উপজাতির বসবাস। আফগানিস্তানের প্রায় ৭৭ শতাংশ লোক গ্রামে বসবাস করেন। শহরবাসীর অর্ধেক থাকেন রাজধানী কাবুলে।

৩৪টি প্রদেশ

আফগানিস্তান প্রশাসনিকভাবে ৩৪টি প্রদেশ বা ওয়েলায়েত-এ বিভক্ত। প্রদেশগুলি আবার জেলায় বিভক্ত। প্রতিটি প্রদেশে গভর্নর কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্ত প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। শুধুমাত্র কাবুল শহরটির প্রশাসন কাবুল প্রদেশ থেকে স্বাধীন।

প্রদেশগুলো হচ্ছে- বাদাখশান, বাদগিস, বাগলান, বাল্খ, বামিয়ান, দাইকুন্ডি, ফারাহ, ফারিয়াব, গজনি, ঘাওর, হেলমান্দ, হেরাত, জোওয্জান, কাবুল, কান্দাহার, কাপিসা, খোস্ত, কুনার, কুন্দুজ, লাগমান, লোওগার, নানকারহার, নিমরুজ, নুরেস্তান, ওরুজ্গান, পাক্তিয়া, পাক্তিকা, পাঞ্জশির, পারভান, সামাংগান, সারে বোল, তাখার, ওয়ার্দাক ও জাবুল।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দেশটির পূর্ব-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত। অন্যান্য প্রধান শহরের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণের কান্দাহার, পশ্চিমের হেরত এবং উত্তরের মাজরে শরীফ। ছোট শহরগুলির মধ্যে আছে পূর্বের জালালাবাদ, কাবুলের উত্তরে অবস্থিত চারিকার, এবং উত্তরের কন্দোজ ও ফয়েজাবাদ।

অর্থনীতি

দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুদ আবিষ্কৃত হয়। পেট্রোলিয়াম ও কয়লাও পাওয়া যায়। তামা, লোহার আকরিক, বেরাইট, ক্রোমাইট, সীসা, দস্তা, গন্ধক, লবণ, ইউরেনিয়াম ও অভ্রের মজুদ আছে। দুষ্প্রাপ্য ও অর্ধ-দুষ্প্রাপ্য পাথর নীলকান্তমণি, চুনি, মণি, নীলা ও পান্নারও উৎসস্থল। লিথিয়াম রয়েছে। আছে সোনাও।

গম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য। রয়েছে যব, ভুট্টা ও ধান। তুলাও ব্যাপকভাবে চাষ করা হয়। রপ্তানিকৃত দ্রব্য কিশমিশ, এপ্রিকট, চেরি, ডুমুর, তুঁত ও ডালিমসহ বিভিন্ন ফল ও বাদাম। এছাড়া হস্তনির্মিত কার্পেট, কম্বল, পশম, তুলা, চামড়া, ও নানা ধরনের মণিপাথর প্রধান। আঙুর ও তরমুজ খুব মিষ্টি হয়। বিভিন্ন জাতের ভেড়া ও ছাগলও পালন করা হয়। কারাকুল ভেড়ার শক্ত, কোঁকড়া লোম দিয়ে কোট তৈরি করা হয়। প্রচুর আফিম ও পপিফুল উৎপাদন হয়।

আমু দরিয়া নদী

দেশটির উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম ও দক্ষিণের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি মূলত মরুভূমি ও পর্বতশ্রেণী। আমু দরিয়া নদী ও এর উপনদী পাঞ্জ দেশটির উত্তর সীমান্ত নির্ধারণ করেছে। আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক এলাকার উচ্চতা সমুদ্র সমতল থেকে ২,০০০ মিটার বা তার চেয়ে উঁচুতে অবস্থিত। ছোট ছোট হিমবাহ ও বছরব্যাপী তুষারক্ষেত্র প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। দেশটির একমাত্র নৌ-পরিবহনযোগ্য নদী উত্তর সীমান্তের আমু দরিয়া।

পর্বতশৃঙ্গ

উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত ৭,৪৯২ মি উচ্চতা বিশিষ্ট নওশাক আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ও সর্বোচ্চ বিন্দু। সফেকদ কোহ-তেই রয়েছে বিখ্যাত খাইবার গিরিপথ, যা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ। আফগানিস্তানের বেশির ভাগ প্রধান নদীর উৎপত্তি পার্বত্য জলধারা থেকে।

হ্রদ

হ্রদগুলির মধ্যে আছে তাজিকিস্তান সীমান্তে ওয়াখান করিডোরে অবস্থিত জার্কোল হ্রদ, বাদাখশানে অবস্থিত শিভেহ হ্রদ এবং গজনীর দক্ষিণে অবস্থিত লবণাক্ত হ্রদ ইস্তাদেহ-ইয়ে মোকোর। সিস্তান হ্রদ বা হামুন-ই-হেলমান্দ হেলমান্দ নদীর শেষসীমায় ইরানের সীমান্তে অবস্থিত।

কৃত্রিম জলাধার

জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কিছু কিছু নদীতে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম জলাধার সৃষ্টি করা হয়েছে। এদের মধ্যে আছে কাবুল শহরের পূর্বে কাবুল নদীর উপরে নির্মিত সারোবি ও নাগলু বাঁধ, হেলমান্দ নদীর উপর নির্মিত কাজাকি জলাধার, এবং কান্দাহার শহরের কাছে হেলমান্দ নদীর একটি উপনদীর উপর নির্মিত আর্গান্দাব বাঁধ।

উদ্ভিদরাজি

আফগানিস্তানের উদ্ভিদরাজি বিচিত্র। পর্বতে চিরসবুজ বন, ওক, পপলার, হেজেলনাট ঝাড়, কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম ইত্যাদি দেখা যায়। উত্তরের সমতলভূমি মূলত শুষ্ক, বৃক্ষহীন ঘাসভূমি, আর দক্ষিণ-পশ্চিমের সমভূমি বসবাসের অযোগ্য মরুভূমি। শুষ্ক অঞ্চলের গাছের মধ্যে আছে ক্যামেল থর্ন, লোকোউইড, মিমোসা, ওয়ার্মউড, সেজব্রাশ ইত্যাদি।

পশু-পাখি

আছে আর্গালি, উরিয়াল, আইবেক্স বা বুনো ছাগল, ভালুক, নেকড়ে, শেয়াল, হায়েনা ও বেঁজি। বন্য শূকর, শজারু, ছুঁচা, বন্য খরগোশ, বাদুড় এবং অনেক তীক্ষèদন্তী প্রাণী। রয়েছে গ্যাজেল হরিণ, চিতা, বরফ চিতা, মার্কর ছাগল, এবং বাকত্রীয় হরিণ। প্রায় ২০০ জাতের পাখিরও দেখা মেলে। ফ্লেমিংগো ও অন্যান্য জলচর পাখি গজনীর উত্তরে ও দক্ষিণে হ্রদ এলাকায় দেখা যায়। সাইবেরীয় বক, হাঁস ও তিতির জাতীয় পাখিও চোখে পড়ে।

মোল্লা

আফগান জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন মোল্লা। কুরআন শরীফ মুখস্থ বলতে পারেন। জুমআর নামাজ, বিয়ে ও দাফন কাজ পরিচালনা করেন। মানুষদের ইসলামের বিধিবিধান শিক্ষা দেন। ইসলামী আইননুসারে সংঘাত নিরসন করেন এবং শারীরিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান দেন। নির্ধারণ করেন কী করতে পারবে বা পারবে না।

সংস্কৃতি

আফগানিস্তান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক ভিন্ন সংস্কৃতির অধিকারী। কবিতা আফগানিস্তানের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ এবং এটি ১০০০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির ইতিহাসের অংশ। আফগানিস্তানে গল্প-গাঁথা বলার শিল্প এখনও সগৌরবে বিরাজমান। সঙ্গীতের সাথে লোকগাঁথা বর্ণনা করার ঐতিহ্য আজও আদৃত।

আফগান জীবনের সমস্ত দিক নিয়েই এই গাথাগুলি রচিত এবং এগুলির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণ শিক্ষা দেয়া হয়। আফগানিস্তানের সঙ্গীত মূলত ঐতিহ্যবাহী লোক সঙ্গীত, গাথা ও নৃত্য। পশতুন অঞ্চলের আত্তান নৃত্য জাতীয় নৃত্য। এতে নর্তকেরা একটি বড় বৃত্তে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন এবং দ্রুত লয়ে সঙ্গীতের ছন্দের সাথে পা নাড়ান।

খেলা

বুজকাশি আফগানিস্তানের জাতীয় খেলা। এই প্রতিযোগিতা মূলক খেলাটিতে একজনকে ঘোড়ায় চড়া অবস্থায় ছাগল ধরতে হয়। আফগানিস্তানে বছরের শুরুর দিনটি ২১শে মার্চ উদযাপন করা হয়, যা বসন্তের প্রথম দিন।

স্থাপত্যকলা

আফগানিস্তানে সব যুগের স্থাপত্যকলার নিদর্শন পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে আছে গ্রিক ও বৌদ্ধ স্থাপত্যের ধ্বংসস্তুপ, মন্দির, খিলান, স্তম্ভ, সুক্ষ্ম কারুকাজময় ইসলামী মিনার ও দুর্গ।

হেরাত ও মাজার-ই-শরিফের মসজিদদ্বয়, পশ্চিম-মধ্য উঁচু এলাকার জাম শহরের একটি মসজিদের মিনার, ১০০০ বছরের পুরনো কালে-ইয়ে বোস্তের মহান খিলান, চেল জিনা, কান্দাহারের সম্রাট বাবরের রেখে যাওয়া পাথরের খোদাইকর্ম, বামিয়ানের বুদ্ধ, গজনীর বিজয় চূড়া, বাবরের সমাধি ও কাবুলের বালা হিস্সার।

শিল্পকলা

শিল্পকলার মধ্যে হেরাতের হালকা নীল-সবুজ টাইলের কাজ, রঙিন ক্যালিগ্রাফি বা হস্তলেখাশিল্প উল্লেখ্য। সোনা ও রূপার গয়না, সূচিশিল্প, ও চামড়ার বিভিন্ন দ্রব্য আজও ঘরে ঘরে বানানো হয়। বিখ্যাত শিল্পকর্ম হল পারসিক-ধাঁচে বানানো কার্পেট।

যাতায়াত ব্যবস্থা

কিছু কিছু রাস্তা শীতকালে ও বসন্তকালে বরফ পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। শহরগুলিতে তিন চাকার অটোরিক্সা সাধারণ যানবাহন। অনেক জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হয়। গ্রামাঞ্চলে আফগানিরা পায়ে হেঁটে, গাধা বা ঘোড়ার কিংবা মাঝে মাঝে উটের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করে।

আফগানিস্তানের কান্দাহার বিমানবন্দরের রানওয়েটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত রানওয়ে হিসাবে গণ্য করা হয়। এছাড়া রয়েছে- হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হেরাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং মাযার-ই-শরীফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কাবুল এবং অন্যান্য বড় বড় শহরগুলির সাথে উড়ানের সাথে প্রায় এক ডজন গার্হস্থ্য বিমানবন্দর রয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী স্থান

জামের মিনার পূর্ব আফগানিস্তানে হারি নদীর তীরে ঘোর রাজ্যের সাহরাক জেলায় অবস্থিত। ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। ২৪০০ মিটার পর্যন্ত উচু পাহাড় বেস্টিত ৬৫ মিটার উচু এই মিনার। সম্পূর্ণ পোড়া মাটির ইট দিয়ে ১১৯০ সালে নির্মিত হয়েছে। জটিল ইট, আস্তর এবং পালিশ করা টালি সজ্জার জন্য মিনারটি প্রসিদ্ধ। বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফি যেমন কুফিক, নাস্খ, বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার এবং কুরআনের আয়াত খোদাই করা রয়েছে।

বান্দ-এ-আমির

বান্দ-এ-আমির পার্কটিকে ২০০৯ সালে জাতীয় পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পার্কটিতে রয়েছে ছয়টি লেক। দারুণ বনভূমিতে রয়েছে পারস্য চিতা এবং আফগানের স্নো ফিঞ্চ নামের গান গাওয়া পাখি। ৫৭০ স্কয়ার ফিটের উপরে নির্মিত হয়েছে পার্কটি।

দারুল আমান প্রাসাদ

দারুল আমান প্রাসাদ বা শান্তির বাসস্থান আফগানিস্তানের কাবুলের কেন্দ্র থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট, প্রাসাদটি আফগানিস্তানের শততম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে পুনর্নির্মিত হয়।

ইউরোপীয় নব্যধ্রুপদীয় ধাচে নির্মিত এই প্রাসাদটি একটি ইউ-আকৃতির ইট-নির্মিত ভবন। একটি অর্ধবৃত্তাকার প্রধান হল সহ এতে ১৫০টি কক্ষ ও তিনটি তলা রয়েছে। ভবনটির সর্বোচ্চ বিন্দু সমতল থেকে প্রায় ৩৩ মিটার (১০৮ ফুট) উঁচুতে অবস্থিত।

এর ছাদে চারটি গম্বুজ রয়েছে। তৃতীয় তলার দক্ষিণ দিকের গ্যালারিগুলো বেশ কিছু করিন্থীয় স্তম্ভ দ্বারা সজ্জিত। প্রত্যেকটি তলাই মার্বেল নির্মিত সর্পিলাকার সিঁড়ি দ্বারা যুক্ত।

আফগানিস্তানের সংসদ

জাতীয় পরিষদ (আফগানিস্তান) দারুল আমান প্রাসাদের বিপরীতে অবস্থিত আফগানিস্তানের সংসদ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে যার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

রাষ্ট্রপতির বাসভবন

আর্গ (কাবুল) আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতির বাসভবন। এটি ৮৩ একর জমির উপর অবস্থিত।

জাতীয় যাদুঘর

আফগানিস্তান জাতীয় যাদুঘর আফগানিস্তানের কাবুল শহরের কেন্দ্রের ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি দ্বিপক্ষীয় ভবন। দর্শকরা যাদুঘরটির সুবিশাল উদ্যান ঘুরে বেড়াতে পারে। মধ্য এশিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী জাদুঘরগুলির মধ্যে অন্যতম। এখানে ১০০,০০০ এর অধিক স্বতন্ত্র বস্তু সৃশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত রয়েছে।

শিক্ষাব্যবস্থা

আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়, আফগানিস্তান- একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। একমাত্র জাতীয়ভাবে স্বীকৃত, বেসরকারি, অলাভজনক, নিরপেক্ষ এবং সহ-শিক্ষাযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। এটি আফগানিস্তানের চাহিদা পূরণের জন্য ছাত্রছাত্রী প্রস্তুত করে বিশ্বব্যাপী উচ্চতর শিক্ষা প্রদানের জন্য নিবেদিত।

কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় কাবুলে অবস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে মূলতঃ শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসাবে তৈরী করা এবং সমৃদ্ধিময় অংশীদারদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সম্প্রদায় ও উদ্ভাবনী চিন্তার অনুশীলনের একটি বিশেষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি

বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তিগুলির মধ্যে অন্যতম। ষষ্ঠ শতাব্দীতে তৈরি প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো। মধ্য আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫০০ মিটার বা ৮২০০ ফিট উচ্চতায় একটি পর্বতগাত্রে খোদাই করা। বড় মূর্তিটির উচ্চতা ৫৫ মিটার আর ছোটটির উচ্চতা ৩৫ মিটার। ইউনেস্কো এই মূর্তিগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বামিয়ানের গুহা পৃথিবীর সর্বপ্রথম তৈলচিত্রের জন্য বিখ্যাত।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: [email protected]

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *