ধনী দেশ থেকে ব্যর্থ রাষ্ট্র নাউরো!

একসময়ের প্লেজেন্ট আইল্যান্ড নাউরো। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম গণতান্ত্রিক দেশ। বলা হতো প্রশান্ত মহাসাগরের কুয়েত। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী রাষ্ট্র। এরপর সরকারের অব্যাবস্থাপনা, দুর্নীতি, দুর্বল প্রশাসন ও বিরুপ পলিসির কারণে দেশটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। ছিল না কোনো আবাদি জমি কিংবা জনগণের কোনো নিশ্চিন্ত জীবন।

মাত্র দুই দশকেই বিশাল প্রতিপত্তির মালিক দেশটিই ভাড়াটে রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। অন্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পেতেও চলেছে। কালের বিবর্তনে করুণ দশায় এসে দাড়ানো যেন রাজার হাল থেকে পথের ফকিরে পরিণত হওয়া! তবে বর্তমানে আবার অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে রাজা থেকে প্রজা বনে যাওয়া রাষ্ট্র নাউরো। আজ জানাব প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ভেসে থাকা অদ্ভুত দেশ নাউরো সম্পর্কে।

একনজরে নাউরো

নাম: নাউরো প্রজাতন্ত্র
কার্যত রাজধানী: ইয়ারেন
বৃহত্তম শহর: ডেনিগোমডু
সরকারি ভাষা : ইংরেজি ও নাউরোয়ান

জাতীয়তা: নাউরোয়ান
সরকার: সংসদীয় প্রজাতন্ত্র
আইনসভা: পার্লামেন্ট
প্রেসিডেন্ট: লিওনেল আইনগিমেয়া
পার্লামেন্টের স্পীকার: মার্কোস স্টিফেন

স্বাধীনতা: ১৯৬৮ সালের ৩১ জানুয়ারি
আয়তন: ২১ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্যা: ১৩ হাজার ৫২৮ জন
মুদ্রা: অস্ট্রেলিয়ান ডলার

নাউরোর অবস্থান

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাইক্রোনেশিয়া অঞ্চলের ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র নাউরো। ওশেনিয়া মহাদেশে অবস্থিত ডিম্বাকৃতির দেশটি পৃথিবীর তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। ফসফেট পাথরের ভুমি থাকা তিনটি দেশের একটি। রাষ্ট্রটির নেই কোনো অফিসিয়াল রাজধানী। নেই নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী।

প্রতিবেশী দু তিনটি দেশ ছাড়া কোনো দেশে অ্যাম্বাসিও নেই। নাউরো যেতে হলে ফিজির পোর্ট ব্যবহার করে যেতে হয়। অথচ ছোট দেশটির অবস্থান গিয়ে পৌঁছেছিল কমনওয়েলথ এবং অলিম্পিক গেমস পর্যন্তও! নাউরু ১৯৯৯ সালে জাতিসঙ্ঘের সাথে যুক্ত হয়।

নাউরোর সরকার ব্যবস্থা

নাউরুতে ঐতিহ্যগতভাবে ১২টি গোষ্ঠী বা উপজাতি ছিল, যা দেশের পতাকাটির ১২-ইঙ্গিত তারকাতে প্রতিনিধিত্ব করে। নাউরু একটি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে একটি প্রজাতন্ত্র। প্রেসিডেন্টই রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারের প্রধান।

১৯-সদস্যের একটি একক সংসদ রয়েছে। প্রতি তিনবছর পরপর এই ১৯ সংসদ নির্বাচিত হয়। সংসদ তার এই ১৯ সদস্যদের থেকে একজনকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে, এবং সংসদে একজন সভাপতি থাকেন। সভাপতি পাঁচ থেকে ছয় সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা নিয়োগ করে।

নাউরোর রাজনীতি

দেশটির প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই শিক্ষিত। নাউরোর নিজস্ব ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা খুব কম। নাউরোতে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কোনও আনুষ্ঠানিক কাঠামো নেই এবং যে কেউ যখন তখন দল গঠন করতে পারে। আবার দল ছাড়াই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। নাউরোর রাজনীতিতে সক্রিয় এমন চারটি দলঃ ১) নুরা পার্টি ২) ডেমোক্রেটিক পার্টি ৩) নাউরো ফার্স্ট ৪) কেন্দ্র পার্টি।

নাউরোর অর্থনীতি

বর্তমানে নাউরোর অর্থনীতির মূল উৎস হলো ফসফেট মাইনিং, অফসোর ব্যাংকিং, মৎস্য শিকার ও বৈদেশিক সহায়তা। নারিকেল উৎপাদনের জন্যও বিখ্যাত। দ্বিতীয় স্তরের ফসফেটের মজুত আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে নাউরু আবার অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠছে।

নাউরুর ভবিষ্যতে প্লেজেন্ট আইল্যান্ড হবার কিছু আশা এখনো আছে। নাউরোর বিশাল সামুদ্রিক এলাকা জুড়ে প্রচুর টুনা মাছ পাওয়া যায়। অন্য দেশের জেলেরা টাকা দিয়ে নাউরোর সীমানায় মাছ ধরে। এখনও পর্যন্ত এটা বেশ লাভজনক। অস্ট্রেলিয়ার সাহায্যে জলযান সংস্কার শিল্প বানানোর চেষ্টা চলছে।

নাউরোর প্রশাসনিক জেলা

নাউরু ১৪টি প্রশাসনিক জেলায় বিভক্ত এবং ৮টি নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত। প্রতিটি জেলাকে গ্রামে বিভক্ত করা হয়েছে। সর্বাধিক জনবহুল জেলা ডেনিগোমোডু। অন্যান্য জেলাসমূহ- আইয়, আনাবার,আনেটান, আনিবারে, বাইটসি, বো, বাউদা, এওয়া, ইজুউ, মেনেং, নিবোক ও উআবো।

ইয়ারেন জেলাকেই কার্যত রাজধানী হিসেবে গণ্য করা হয়। জেলাটিকে ১৯৬৮ সালে সৃষ্টি করা হয়। এর আদি নাম ছিল মাকুয়া। মাকুয়া নামটি একটি ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির হ্রদের নাম থেকে এসেছে। এই হ্রদটি নাউরুর জনগণের সুপেয় পানির প্রধান উৎস।

মোটা মানুষদের দেশ নাউরো

পৃথিবীর সবচেয়ে মোটা মানুষদের বসবাস নাউরুতে। এখানকার প্রতিটা মানুষই অস্বাভাবিক রকমের মোটা ও স্বাস্থ্যবান। নাউরুকে মোটা মানুষের দেশও বলা হয়। অথচ এদের নিজস্ব কোনো খাবার নেই! ফলে নিম্নমানের খাবার এবং নানা রোগে ভুগছে জনগণ।

নাউরুর ৯৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৯৩ শতাংশ নারী স্থূলতার শিকার। মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নাগরিকের রয়েছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস। কিডনি বিকল এবং হৃদরোগ সেখানে খুবই স্বাভাবিক। নাউরুর ৯০ শতাংশ নাগরিকই বেকার।

 সামুদ্রিক পাখির অভরায়ণ্য

কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পাখির অভরায়ণ্য ছিলো প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝের নাউরো। আশেপাশে কোন ভূখণ্ড না থাকায় হাজার হাজার বছর ধরে সামুদ্রিক পাখি তাদের যাত্রা বিরতি ও টয়লেট হিসাবে এই দ্বীপকে ব্যবহার করতো। পাখিদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য-মল কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে জমতে জমতে উৎকৃষ্ট মানের ফসফেটের টিলায় পরিণত হয়। যা পরবর্তীকালে ‘স্বর্ণের খনি’ হয়ে ধরা দেয়।

সর্বোৎকৃষ্ট মানের ফসফেট

ফসফেট কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান। নাউরোর ফসফেট ছিলো পুরো পৃথিবীতে সর্বোৎকৃষ্ট মানের। এর শতকরা ৮০-৯০% বিশুদ্ধ-উন্নতমানের ফসফেট। দেশটিতে আবাদি জমি প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ সেখানে রয়েছে চাষাবাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট উপাদানটি। নাউরোর ফসফেটের বড় অংশ ব্যবহার হতো অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের কৃষিকাজে।

নাউরোর ইতিহাস

ধারনা করা হয়, অন্তত তিন হাজার বছর আগে নাউরোতে মানুষের বসবাস শুরু হয়। ১৭৯৮ সালে তিমি মাছ শিকারি ব্রিটিশ জন ফেয়ার্ন দ্বীপটি আবিষ্কার করে নাম দেন প্লেজেন্ট আইল্যান্ড।

১৮৮৮ সালে ব্রিটেনের সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে জার্মানি নাউরো দখল করে। ১৯০০ সালে জার্মানরা প্রথম নাউরোতে ফসফেট খনির সন্ধান পায়। ১৯০৬ সালে ‘প্যাসিফিক ফসফেট কোম্পানি’ এর নামে এখান থেকে তারা ফসফেট উত্তোলন শুরু করে।

১৯০৭ সাল থেকে এখানকার অর্থনীতির প্রধান আয় আসে ফসফেট খনিজ আকরিক আহরণের মাধ্যমে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অস্ট্রেলিয়া নাউরো দখল করে। যুদ্ধ শেষ হলে লীগ অফ নেশনের অধীনে নাউরুর প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়াকে।

‘ব্রিটিশ ফসফেট কমিশন’ এর নামে ফসফেট উত্তোলন চলতে থাকে। আর এর সুবিধা নেয় ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান নাউরো দখল করে। যুদ্ধ শেষে নাউরোর দায়িত্ব আবার ঐ তিন দেশের কাছে চলে আসে।

১৯৬৮ সালে নাউরো স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৭০ সালে ২১ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার দিয়ে নাউরো ফসফেট কোম্পানি কিনে নেয়। ‘নাউরো ফসফেট কর্পোরেশোন’ পুরোদমে ফসফেট উত্তোলন চালাতে থাকে। আর সেই ফসফেট বিক্রি করতে থাকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে।

জাহাজে পণ্য তোলার জন্য প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে গড়ে তুলে বিশাল আকৃতির ক্রেন। নাউরোর সরকারের হাতে আসতে থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ১৯৭০-৮০ এর দশকে দেশটিতে ছিল ফসফেট খনির রমরমা ব্যবসা। সে সময় নাউরোুর অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভালো।

ঐ সময় মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে নাউরোর উপরে ছিল শুধু সৌদি আরব। প্রতিবছর গড়ে ফসফেট বিক্রি করে আয় করত ১০০-১২০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার। খরচ বাদে উদ্বৃত্ত থাকত ৮০ মিলিয়ন ডলার। রাষ্ট্রের বড় বড় পদে নিয়োগের জন্য অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের নিয়ে আসা হতো।

ফসফেট খনিতে নাউরোর বাসিন্দারা কাজ করত না। খনিতে কাজ করার জন্য ফিলিপাইন, চীন, কিরিবাতি থেকে শ্রমিকরা আসত। ফসফেট বিক্রি করে যে আয় হতো, তার একটা অংশ আবার জনগণ পেত।

শিক্ষা, চিকিৎসা, সংবাদপত্র, যানবাহন সব ছিল ফ্রি। কোনো ধরনের ট্যাক্সও ছিল না। রাস্তায় বিলাসবহুল গাড়ি চলত। যেই দেশ সাইকেলে চড়ে ১.৫ ঘণ্টায় ঘুরে আসা যায়, সেখানে স্পোর্টস কার চলত।

মাথাপিছু আয়ে যখন শীর্ষে নাউরো

১৯৭৫ সালে নাউরোর সরকারি ব্যাংকে জমা হয় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার! স্বাধীনতার পর এক যুগের অর্ধেক সময়ে কোনো রাষ্ট্রের এত বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হওয়া বিরল। আর সে সময় নাউরোর জনসংখ্যা ছিলো ৭০০০ এর কাছাকাছি।

নাউরোর জনগণের মাথাপিছু আয় এত বেশি ছিলো যে, তাদের সামনে একমাত্র ধনী রাষ্ট্র ছিলো কুয়েত। নাউরোকে তখন বলা হতো প্যাসিফিকের কুয়েত। তেল রাজ্য কুয়েতের মতোই সহজ অর্থ আয় করতে থাকে নাউরো।

 টাকা উড়াচ্ছিলো নাউরো কর্তৃপক্ষ

ফসফেট বিক্রি করেই নাউরো সৌদি আরবের চেয়েও বেশি অর্থ উপার্জন করেছিল! নাউরোর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাদের পরবর্তী কয়েক প্রজন্মকে আরামেই খাইয়ে-পরিয়ে রাখা যেতো। কিন্তু তাদের এই অর্থ দেশের উন্নয়নের জন্য খরচ করা ছিলো অত্যন্ত জরুরি। উন্নত চিকিৎসা, উচ্চ শিক্ষা, মানসম্মত বাসস্থান- এসব কাজে খরচ করার জন্য এই অর্থ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু নাউরু কর্তৃপক্ষ দামি বাড়ি, বিলাসবহুল হোটেল এবং গলফ কোর্ট বানায়।

নাউরো কর্তৃপক্ষ এমনভাবে টাকা উড়াচ্ছিলো, যেন তা কোনদিনই শেষ হবে না। পশ্চিমা দেশ থেকে খাদ্য আমদানি করার উদ্দেশ্যে একটি বিমানবন্দর বানায়। যার আয়তন মাত্র ৩০ কিলোমিটার! খাদ্য উৎপাদন করার চেয়ে বহির্দেশ থেকে খাবার আনাতে থাকে। সেজন্য সাতটি বোয়িং বিমান কেনে। এয়ার নাউরোর অধীনে থাকা ৭টা বিমান দিয়ে নাউরোর জনগণ অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, সিঙ্গাপুর যেত মার্কেট করতে।

বোয়িং বিমান চালিয়ে নিখোঁজ জেলেদের খোঁজা হতো। সবকিছু একসাথে দেখভাল করার জন্য তারা ‘নাউরো ফসফেট রয়্যালিটিস ট্রাস্ট’ গঠন করে। ফসফেট বিক্রির একটা অংশ চলে যেত ট্রাস্টে। তারা আবার পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় লাভজনক বিনিয়োগ করত। আমেরিকা, ব্রিটেন, নিউজিল্যান্ড, ভারত, ফিজি, ফিলিপাইন বিভিন্ন দেশে তাদের বিনিয়োগ ছিল। এর মধ্যে ছিল হোটেল, ফ্ল্যাট, গলফ মাঠ, ফসফেট কোম্পানি। মেলবোর্নে ছিল ৫২ তলা বিশিষ্ট ‘নাউরো হাউস’ ।

যেভাবে নিঃস্ব নাউরো

অব্যবস্থাপনা, বিলাসিতা, অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অবাস্তব পরিকল্পনা- সবকিছু নাউরোকে নিঃস্ব করে দিতে শুরু করে। সরকারি লোকজন রাষ্ট্রের টাকায় বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, লন্ডন এবং ফিজির মতো দেশগুলোতে তৈরি করে নিজেদের বিলাসবহুল হোটেল। এর ফলে তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার করতে থাকে।

‘নাউরো ফসফেট রয়্যালিটিস ট্রাস্ট’ যার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন দেশে নাউরোর জন্য সম্পদ কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা, ভুল পরিচালনা আর দায়িত্বহীনতায় একের পর এক তাদের প্রজেক্ট লোকসান হতে থাকে । ৯৫ সালে নিউইয়র্কে এক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পে তারা লোকসান করে ১২ মিলিয়ন ডলার । এর মাঝে প্রতারক চক্র ভুয়া ক্রেডিট আর ব্যাংক নোট দিয়ে ট্রাস্ট থেকে হাতিয়ে নেয় ৬০ মিলিয়ন ডলার।

কালো টাকা সাদা করার আখড়া নাউরো

৯০ দশকের শুরুর দিকেই নাউরো বুঝতে পারল, তাদের খনি শেষ হয়ে আসছে। আগের মত বিলাসী জীবন চালু রাখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা ঋণ করা শুরু হল। ১৯৮৯ সালে নাউরু আন্তর্জাতিক আদালতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করল, স্বাধীনতার আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসন নিয়ে বিশেষ করে , খনি চালাতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করার কারনে।

কোর্টের বাইরে ৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে এই মামলার মীমাংসা করা হয়। অর্থ উপার্জনের জন্য নাউরুর সরকার বিভিন্ন অপ্রচলিত পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে নাউরো কালো টাকা সাদা করার আখড়াতে পরিণত হয়।

জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত

তাদের ফসফেটের প্রাথমিক স্তরের মজুত কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ফসফেট রপ্তানি ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রীয় উপার্জন না থাকায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ফাঁকা হয়ে পড়ে। সরকার অন্যান্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে রাষ্ট্র চালাতে থাকে।

১৯৯৩ সালে অন্য রাষ্ট্রের থেকে ধার করা অর্থ ফেরত দিতে অর্থ উপার্জনের জন্য লন্ডনভিত্তিক ব্যান্ড ‘ইউনিট ফোর প্লাস টু’ কে দিয়ে সঙ্গীত অনুষ্ঠান আয়োজন করতে থাকে। তারা ভেবেছিল লন্ডনে তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে উঠে আসবে রাষ্ট্র চালানোর অর্থ। মাত্র দু সপ্তাহ চলার পর ইউনিট ফোর প্লাস টু এর অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

সেইসাথে নাউরোর উপর ফেলে দেয় ৭ মিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা! অনুষ্ঠানের পেছনে যে সকল প্রতিষ্ঠান অর্থ খরচ করেছিল, তারা নাউরোর সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নেয়। সাথে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় পুরো জাতির ভবিষ্যৎ।

পথে বসে পুরো নাউরো জাতি

একপর্যায়ে সব ঋণ শোধ করার জন্য নাউরোর সব আন্তর্জাতিক রিয়েল এস্টেটের বিপরীতে ২৪০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার ঋণ নেওয়া হয়। স্বাভাবিকভাবেই সব ঋণ শোধ করা গেলেও ২৪০ মিলিয়ন ডলার শোধ করা যাচ্ছিল না। কারন তাদের তো আয়ের কোন উৎসই নেই।

একপর্যায়ে ঋণদাতারা নাউরোর সমস্ত রিয়েল এস্টেট অধিগ্রহনের অধিকার পেয়ে গেল। এক পর্যায়ে এমনকি তারা নাউরোর একমাত্র বিমানটাও নিয়ে গেল। ৭টা বিমান থেকে তখন শুধু একটা বিমানই ছিল। অল্প সময়েই পথে বসতে বাধ্য হয় পুরো নাউরো জাতি।

দুর্দশার দিকে এগিয়ে যায় নাউরো

পুরো নাউরোই আসলে ফসফেটের খনি, এর ফলে দ্বীপের প্রায় ৯০% জায়গা ফসফেটের জন্য খনন করা হয়েছে। ফলে নাউরো চাষাবাদের অযোগ্য দেশে পরিণত হয়েছে। জমিতে কোনোপ্রকার চাষাবাদ সম্ভব না। কোনোরকম শস্যই উৎপাদন হয় না।

ফসল আবাদ না হওয়ায় ফলমুল থেকে যাবতীয় সকল প্রকার খাদ্যই বাইরে থেকে আমদানী করে আনা হয়। নিজস্ব খাবার বলতে কিছু সামুদ্রিক মাছই শুধু রয়েছে। মূলত মাত্রাতিরিক্ত খোঁড়াখুড়ির ফলে আশেপাশের সকল পানি দূষিত হয়ে পড়ে। আর সেই সাথে লোকজন সবাই মিলে একটি জেলখানায় আটকা পড়ে যায়। এদের সকলের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা নাউরু সরকারের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।

নাউরু সরকার ঘোষণা দেয়, ২০ হাজার ডলার দিয়ে যেকেউ চাইলে নাউরোতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু এতে হয় হিতে বিপরীত। দিনে দিনে নাউরো আরও দুর্দশার দিকে এগিয়ে যায়। ছোট দেশের বড় সমস্যা দেখা দেয়।

মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা

২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার নাউরোতে উদ্বাস্তু শিবির কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। যারা অস্ট্রেলিয়াতে পালিয়ে আসত কিংবা কোনো কঠিন অপরাধে অস্ট্রেলিয়া সরকার যাদের দেশ থেকে বিতারিত করার নির্দেশ দিত, তাদের ঠিকানা হতো নাউরো। এজন্য নাউরোকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ভাড়া দিত অস্ট্রেলিয়া সরকার। কিন্তু সেখানে নিয়মিত খাবার পানি পেতেও মারামারি করা লাগত।

জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। নানা আন্দোলনের মুখে ২০০৮ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় সেই কেন্দ্র। ২০১৪ সালে আবার চালু করা হয়। ২০১৭-১৮ তে এই সেন্টার চালানোর বিনিময়ে অস্ট্রেলিয়া নাউরোকে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার মানবিক সাহায্য দেয়। অস্ট্রেলিয়া থেকে এই রকম সাহায্য তারা প্রতিবছরই পায় ।

টাকার বিনিময়ে পররাষ্ট্র নীতি পরিবর্তন

নাউরো ছোট দেশ হলেও বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃত এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাধীন দেশের ভোট গুরুত্বপূর্ণ। এটা বুঝে তারা টাকার বিনিময়ে পররাষ্ট্র নীতি পরিবর্তন শুরু করল। ২০০২ সালে চীনের সাথে ১৩০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে চুক্তি করে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার।

২০০৫ সালে চীনের চুক্তি ভেঙে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক করে এর চেয়ে ভালো অফার পেয়ে। ২০০৯ সালে রাশিয়ান সমর্থিত আবখাজিয়া আর দক্ষিণ অসেটিয়াকে স্বীকৃতি দেয়।

রাশিয়া নাউরোকে ৫০ মিলিয়ন ডলার মানবিক সাহায্য করে। ২০১৭ সালে জেরুসালেমকে রাজধানী করা নিয়ে জাতিসংঘে যে ভোট দেওয়া হয়, তাতে ৯টা দেশ বিপক্ষে ভোট দেয়, তার একটা নাউরো।

খেলা ও বিনোদন

ফুটবল এবং ভারোত্তোলনকে দেশটির রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নাউরুর অন্য জনপ্রিয় খেলাসমূহ হল ভলিবল, নেটবল, টেনিস এবং মাছ মরা। জুডোতেও অংশগ্রহণ করে। বাস্কেটবল খেলে। রাগবি সেভেন্স খেলার জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

 

About পরিবার.নেট

পরিবার বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন ‘পরিবার ডটনেট’ এর যাত্রা শুরু ২০১৭ সালে। পরিবার ডটনেট এর উদ্দেশ্য পরিবারকে সময় দান, পরিবারের যত্ন নেয়া, পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা, পারিবারিক পর্যায়েই বহুবিধ সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরি করে সমাজকে সুন্দর করার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ডটনেট চায়- পারিবারিক সম্পর্কগুলো হবে মজবুত, জীবনে বজায় থাকবে সুষ্ঠুতা, ঘরে ঘরে জ্বলবে আশার আলো, শান্তিময় হবে প্রতিটি গৃহ, প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মানবিক মান-মর্যাদা-সুখ নিশ্চিত হবে । আগ্রহী যে কেউ পরিবার ডটনেট এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো বিষয়ে লেখা ছাড়াও পাঠাতে পারেন ছবি, ভিডিও ও কার্টুন। নিজের শখ-স্বপ্ন-অনুভূতি-অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে পারেন সবার মাঝে। কনটেন্টের সাথে আপনার নাম-পরিচয়-ছবিও পাঠাবেন। ইমেইল: poribar.net@gmail.com

View all posts by পরিবার.নেট →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *